কুষ্ঠরোগের নাম শুনলেই অনেকের মনে হয়, এই রোগ হয়তো এখন আর বাংলাদেশে নেই। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। বাংলাদেশ অনেক আগেই জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে কুষ্ঠ নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেও দেশে এখনো নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশবিষয়ক সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে ৩,৫৫৮ জন কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৮৫ জন শিশু। রোগ শনাক্ত হওয়ার সময় ২০৮ জনের গ্রেড ২ প্রতিবন্ধিতাও ছিল।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ হলো, কুষ্ঠরোগকে অতীতের রোগ ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ত্বকে এমন দাগ দেখা দিলে যেখানে স্পর্শ, ব্যথা বা তাপমাত্রার অনুভূতি কমে গেছে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কুষ্ঠরোগ আসলে কী
কুষ্ঠ বা Hansen disease একটি দীর্ঘস্থায়ী সংক্রামক রোগ। এটি প্রধানত Mycobacterium leprae নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। রোগটি মূলত ত্বক ও শরীরের প্রান্তীয় স্নায়ুকে আক্রান্ত করে। চোখ এবং ওপরের শ্বাসতন্ত্রের কিছু অংশও আক্রান্ত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কুষ্ঠরোগবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, রোগটি নিরাময়যোগ্য। শুরুতেই শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া গেলে স্থায়ী স্নায়ু ক্ষতি ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ত্বকের অবশ দাগ কেন গুরুত্বপূর্ণ
কুষ্ঠরোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলোর একটি হলো ত্বকে এমন দাগ তৈরি হওয়া, যেখানে স্বাভাবিক অনুভূতি কমে যায় বা একেবারেই থাকে না। দাগটি আশপাশের স্বাভাবিক ত্বকের তুলনায় হালকা অথবা লালচে হতে পারে।
কখনো একটি দাগ থাকতে পারে, আবার একাধিক দাগও দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত জায়গায় স্পর্শ, ব্যথা কিংবা গরম ও ঠান্ডার অনুভূতি কমে যেতে পারে। হাত বা পায়ের কোনো অংশে অসাড়তা এবং পেশির দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে।
তবে ত্বকে দাগ বা অবশভাব হলেই কুষ্ঠরোগ হয়েছে এমন নয়। অন্য ত্বকের রোগ এবং স্নায়ুর সমস্যাতেও এ ধরনের উপসর্গ হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কুষ্ঠরোগ কি সহজে ছড়ায়
কুষ্ঠ নিয়ে প্রচলিত বড় ভুল ধারণার একটি হলো আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে বসলেই বা তাকে স্পর্শ করলেই রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। বাস্তবে রোগটি এভাবে সহজে ছড়ায় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা না নেওয়া আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘ সময় ঘনিষ্ঠ ও নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে নাক ও মুখ থেকে বের হওয়া জীবাণুযুক্ত ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটতে পারে।
হাত মেলানো, জড়িয়ে ধরা, পাশাপাশি বসা কিংবা একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মতো সাধারণ সামাজিক সংস্পর্শের মাধ্যমে কুষ্ঠ ছড়ায় না। চিকিৎসা শুরু করার পর রোগী অন্যের মধ্যে রোগ ছড়ান না বলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে।
তাই কুষ্ঠরোগীকে পরিবার বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। বরং সামাজিক ভয় ও লজ্জার কারণে রোগ লুকিয়ে রাখলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হতে পারে।
চিকিৎসা করলে কি কুষ্ঠরোগ ভালো হয়
হ্যাঁ, কুষ্ঠরোগ নিরাময়যোগ্য। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একাধিক ওষুধের সমন্বয়ে Multidrug Therapy বা MDT ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।
কুষ্ঠরোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের WHO নির্দেশিকা অনুযায়ী, চিকিৎসায় rifampicin, dapsone এবং clofazimine ব্যবহার করা হয়। রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসার সময় নির্ধারণ করা হয়।
কম জীবাণুযুক্ত রোগের ক্ষেত্রে সাধারণত ছয় মাস এবং বেশি জীবাণুযুক্ত রোগের ক্ষেত্রে ১২ মাস চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোন রোগীর কোন চিকিৎসা প্রয়োজন, সেটি অবশ্যই চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নির্ধারণ করবেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কুষ্ঠরোগের MDT বিনামূল্যে সরবরাহ করে আসছে। তাই রোগ শনাক্ত হলে ভয় বা লজ্জার কারণে চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসা গুরুত্বপূর্ণ।
দেরিতে শনাক্ত হলে কী সমস্যা হতে পারে
কুষ্ঠরোগের ব্যাকটেরিয়া স্নায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনুভূতি কমে যাওয়ার কারণে হাত বা পায়ে কাটা, পোড়া কিংবা অন্য ধরনের আঘাত হলেও আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় তা বুঝতে পারেন না।
সময়ের সঙ্গে স্নায়ু ও পেশির ক্ষতি বাড়তে থাকলে দুর্বলতা এবং স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুরুতেই রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ২০৮ জনের রোগ নির্ণয়ের সময়ই গ্রেড ২ প্রতিবন্ধিতা থাকার তথ্য দ্রুত রোগ শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।
পরিবারের কারও কুষ্ঠরোগ হলে কী করবেন
পরিবারের কারও কুষ্ঠরোগ শনাক্ত হলে তাকে ভয় পাওয়া বা আলাদা করে দেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা পরিবারের সদস্যদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কুষ্ঠ প্রতিরোধের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যসহ ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের পরীক্ষা করা কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের যৌথ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমেও রোগীর সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও পরীক্ষা আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে। উপযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে।
কোন লক্ষণ দেখলে চিকিৎসকের কাছে যাবেন
ত্বকে হালকা বা লালচে দাগের সঙ্গে ওই স্থানের অনুভূতি কমে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। পাশাপাশি হাত বা পায়ে দীর্ঘদিনের অসাড়তা, পেশির দুর্বলতা কিংবা স্নায়ু মোটা হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে অবহেলাও করা উচিত নয়। কারণ লক্ষণগুলো অন্য রোগের কারণেও হতে পারে এবং চিকিৎসকের পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কুষ্ঠরোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগ এখনো কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে কুষ্ঠ নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছিল। কিন্তু এর অর্থ দেশে কুষ্ঠরোগের সংক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে এমন নয়।
২০২৫ সালে ৩,৫৫৮ জন নতুন রোগী এবং তাদের মধ্যে ১৮৫ শিশুর রোগ শনাক্ত হওয়া দেখায় যে দেশে এখনো সংক্রমণ ঘটছে। বাংলাদেশ সরকার এখন ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
কুষ্ঠরোগ নিয়ে ভয়, লজ্জা বা সামাজিক বৈষম্যের পরিবর্তে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসা। বিশেষ করে ত্বকে অনুভূতিহীন দাগ দেখা দিলে সেটি লুকিয়ে না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
সর্বশেষ আপডেট: ৩ অক্টোবর ২০২৬