পেট ফাঁপা ও গ্যাসের সমস্যা কমানোর ঘরোয়া উপায়

খাওয়ার পর পেট ফুলে থাকা, ঢেকুর ওঠা, পেটে চাপ অনুভব করা কিংবা বারবার গ্যাস বের হওয়া খুব সাধারণ সমস্যা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খাবারের ধরন এবং দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করেই এই অস্বস্তি অনেকটা কমানো সম্ভব।

পেটে কিছু গ্যাস থাকা স্বাভাবিক। খাবার ও পানীয় গ্রহণের সময় আমরা কিছু বাতাস গিলে ফেলি। আবার অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়া হজম না হওয়া কিছু শর্করা ভাঙার সময়ও স্বাভাবিকভাবে গ্যাস তৈরি করে।

হজমের সময় গ্যাস কেন তৈরি হয় সে সম্পর্কে NIDDK জানিয়েছে, ঢেকুর, পেট ফাঁপা এবং গ্যাস বের হওয়া স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। তবে সমস্যা নিয়মিত হলে এর পেছনের কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

পেট ফাঁপা ও গ্যাস কেন হয়

খুব দ্রুত খাবার খেলে খাবারের সঙ্গে বেশি বাতাস পেটে প্রবেশ করতে পারে। খাওয়ার সময় বেশি কথা বলা, চুইংগাম চিবানো, স্ট্র দিয়ে পানীয় পান করা এবং কার্বনযুক্ত কোমল পানীয় খেলেও গ্যাসের সমস্যা বাড়তে পারে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ডাল, মটর, বাঁধাকপি, ফুলকপি, পেঁয়াজ কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ফল খাওয়ার পর গ্যাস বেশি হয়। আবার দুধের ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা থাকলে দুধ বা দুগ্ধজাত খাবারের পর পেট ফাঁপতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য, Irritable Bowel Syndrome বা IBS এবং lactose intolerance সহ বিভিন্ন হজমের সমস্যার সঙ্গেও নিয়মিত পেট ফাঁপার সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিন সমস্যা হলে শুধু গ্যাস মনে করে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

ধীরে ধীরে খাবার খান

গ্যাস কমানোর সবচেয়ে সহজ ঘরোয়া অভ্যাসগুলোর একটি হলো ধীরে খাবার খাওয়া এবং ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া। দ্রুত খাবার খাওয়ার সময় বেশি বাতাস গিলে ফেলার কারণে পেটে গ্যাস ও অস্বস্তি বাড়তে পারে।

গ্যাস কমানোর উপায় সম্পর্কে NIDDK ধীরে খাওয়া, বসে খাবার খাওয়া এবং খাওয়ার সময় অতিরিক্ত কথা বলা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। তাই প্রথমে নিজের খাওয়ার অভ্যাসে ছোট পরিবর্তন এনে দেখা যেতে পারে।

একবারে বেশি খাবার খাবেন না

একসঙ্গে অনেক খাবার খাওয়ার পর যদি পেট বেশি ফুলে যায়, তাহলে একবারের খাবারের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দেখা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট পরিমাণে কয়েকবার খাবার খেলে কারও কারও অস্বস্তি কমতে পারে।

তবে খাবারের পরিমাণ কমানোর নামে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার বাদ দেওয়া ঠিক নয়। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন খাবার বা খাওয়ার কোন অভ্যাসের কারণে পেট ফাঁপা বাড়ছে, সেটি ধীরে ধীরে শনাক্ত করা।

কোন খাবারে গ্যাস বাড়ে খেয়াল করুন

সবার গ্যাস একই খাবারে বাড়ে না। একজনের ক্ষেত্রে ডাল বা দুধ খেলে সমস্যা হতে পারে, আবার অন্যজন একই খাবার কোনো অস্বস্তি ছাড়াই খেতে পারেন। তাই নিজের খাবারের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

খাবার ও গ্যাস সম্পর্কে NIDDK পরামর্শ দেয়, কোন খাবার খাওয়ার পর সমস্যা বাড়ছে তা লিখে রাখা যেতে পারে। এতে নিজের জন্য সমস্যা তৈরি করা নির্দিষ্ট খাবার শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

একসঙ্গে অনেক পুষ্টিকর খাবার বাদ না দিয়ে একটি একটি করে পর্যবেক্ষণ করা ভালো। বিশেষ করে দুধ খাওয়ার পর নিয়মিত পেট ফাঁপা, গ্যাস বা পাতলা পায়খানা হলে lactose intolerance আছে কি না পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

কোমল পানীয় ও চুইংগাম কমান

কার্বনযুক্ত কোমল পানীয় থেকে গ্যাস সরাসরি পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে চুইংগাম চিবানো বা স্ট্র দিয়ে পানীয় পান করার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বাতাস গিলে ফেলার সম্ভাবনা থাকে।

তাই নিয়মিত পেট ফাঁপা থাকলে কিছুদিন কোমল পানীয়, চুইংগাম এবং স্ট্র দিয়ে পানীয় পান করা কমিয়ে দেখা যেতে পারে। এরপর সমস্যার মাত্রায় কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না সেটি লক্ষ্য করুন।

খাওয়ার পর অল্প হাঁটুন

খাবারের পর সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসে বা শুয়ে থাকার পরিবর্তে হালকা হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম হজমের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে।

Mayo Clinic পেট ফাঁপা ও ঢেকুর কমানোর সাধারণ জীবনযাপনের পরামর্শের মধ্যে খাবারের পর কিছুটা হাঁটার কথা উল্লেখ করেছে। তবে খাওয়ার পরপরই ভারী ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই।

আদা বা জিরা খেলেই কি গ্যাস সেরে যায়

গ্যাসের ঘরোয়া সমাধান হিসেবে আদা, জিরা, মৌরি এবং বিভিন্ন ভেষজ পানীয়ের ব্যবহার বেশ প্রচলিত। কোনো কোনো মানুষ এগুলো খেয়ে সাময়িক স্বস্তি পেতে পারেন, তবে এগুলোকে নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

কারণ একই ধরনের গ্যাস বা পেট ফাঁপার পেছনে lactose intolerance, IBS, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা অন্য হজমের সমস্যা থাকতে পারে। শুধু ঘরোয়া উপাদানের ওপর নির্ভর করলে আসল সমস্যাটি শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।

বিশেষ করে নিয়মিত কোনো ভেষজ পণ্য বা supplement চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। প্রাকৃতিক বা ভেষজ হলেই কোনো পণ্য সবার জন্য নিরাপদ হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়।

কখন গ্যাসের সমস্যা অবহেলা করবেন না

মাঝেমধ্যে পেট ফাঁপা বা গ্যাস সাধারণত গুরুতর সমস্যার লক্ষণ নয়। কিন্তু সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, ক্রমে বাড়তে থাকে অথবা স্বাভাবিক খাওয়া ও দৈনন্দিন কাজে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে গ্যাসের সঙ্গে তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, পায়খানায় রক্ত, কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, বারবার বমি কিংবা খুব দ্রুত পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি থাকলে অবহেলা করা উচিত নয়।

শেষ কথা

পেট ফাঁপা ও গ্যাসের সমস্যায় প্রথমেই ওষুধ বা তথাকথিত ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। ধীরে খাবার খাওয়া, একবারে অতিরিক্ত না খাওয়া, কোমল পানীয় কমানো এবং নিজের সমস্যা বাড়ায় এমন খাবার শনাক্ত করা দিয়ে শুরু করুন।

খাবারের পর হালকা হাঁটাও উপকারী অভ্যাস হতে পারে। এরপরও যদি পেট ফাঁপা ও গ্যাস নিয়মিত হতে থাকে, তাহলে শুধু গ্যাস মনে করে বারবার ঘরোয়া চিকিৎসা না করে সমস্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ আপডেট: ৩ অক্টোবর ২০২৬

Leave a Comment