ডায়াবেটিস হওয়ার আগেই কি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স শুরু হয়? নীরব পরিবর্তনগুলো বুঝবেন যেভাবে

ডায়াবেটিস ধরা পড়ার আগেই শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন শুরু হতে পারে, যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, অর্থাৎ ইনসুলিনের প্রতি শরীরের কোষগুলোর স্বাভাবিক সাড়া কমে যাওয়া।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স মানেই ডায়াবেটিস নয়। তবে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের বিকাশে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। American Diabetes Association এর ২০২৬ নির্দেশিকা অনুযায়ী, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ইনসুলিন নিঃসরণের ক্ষমতাও ধীরে ধীরে কমতে পারে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের ওজন খুব বেশি না হলেও কিছু মানুষের পেটের ভেতরে চর্বি জমা এবং অন্যান্য বিপাকীয় ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই শুধু শরীরের বাহ্যিক গঠন দেখে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বিচার করা ঠিক নয়।

ইনসুলিন কী এবং কীভাবে কাজ করে?

আমরা খাবার খাওয়ার পর হজম হওয়া কার্বোহাইড্রেট থেকে পাওয়া গ্লুকোজ রক্তে প্রবেশ করে। অগ্ন্যাশয় থেকে তৈরি ইনসুলিন হরমোন শরীরের বিভিন্ন কোষকে সেই গ্লুকোজ গ্রহণ এবং শক্তি হিসেবে ব্যবহারে সাহায্য করে।

কিন্তু কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি আগের মতো সাড়া না দিলে একই কাজ করানোর জন্য শরীরকে বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে হতে পারে। এই অবস্থাকেই সাধারণভাবে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।

প্রথমদিকে অগ্ন্যাশয় বেশি ইনসুলিন তৈরি করে রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই ব্যবস্থা যথেষ্ট না হলে রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে পারে এবং প্রিডায়াবেটিস বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের লক্ষণ কী?

এখানেই সমস্যাটি কিছুটা জটিল। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের এমন কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ নেই যা দেখে একজন মানুষ নিজেই নিশ্চিত হতে পারবেন। অনেকের শরীরে দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে।

কিছু মানুষের ঘাড়, বগল বা শরীরের ভাঁজের ত্বক গাঢ় ও মোটা হয়ে যেতে পারে। একে acanthosis nigricans বলা হয় এবং এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে শুধু এই লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করা যায় না।

কার ঝুঁকি বেশি?

অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি, কম শারীরিক পরিশ্রম, পরিবারে টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকা, উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে অস্বাভাবিক চর্বির মাত্রা ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

নারীদের ক্ষেত্রে PCOS এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে চর্বিযুক্ত লিভার বা metabolic dysfunction associated steatotic liver disease এর সঙ্গেও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমান ADA diabetes screening নির্দেশিকায় PCOS, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, উচ্চ রক্তচাপ, পারিবারিক ইতিহাস এবং fatty liver সহ বেশ কিছু বিষয়কে diabetes ও prediabetes screening এর ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে।

রোগা মানুষেরও কি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হতে পারে?

হ্যাঁ। অতিরিক্ত ওজন গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলেও শুধু ওজন দেখে কারও বিপাকীয় স্বাস্থ্য নির্ধারণ করা যায় না। শরীরের কোথায় চর্বি জমছে, পারিবারিক ইতিহাস এবং দৈনন্দিন শারীরিক কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে দক্ষিণ এশীয়দের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ADA এর বর্তমান নির্দেশিকায় Asian ancestry থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অন্যান্য ঝুঁকি থাকলে BMI ২৩ কেজি প্রতি বর্গমিটার থেকেই diabetes screening বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

কোন পরীক্ষায় সমস্যা ধরা পড়ে?

সাধারণভাবে আলাদা করে insulin resistance মাপার পরীক্ষার পরিবর্তে একজন মানুষের প্রিডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিস আছে কি না এবং সামগ্রিক বিপাকীয় ঝুঁকি কেমন, সেটি নির্ণয় করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এ জন্য HbA1c, fasting plasma glucose এবং প্রয়োজন অনুযায়ী oral glucose tolerance test ব্যবহার করা হয়। ব্যক্তির বয়স, স্বাস্থ্য এবং ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক উপযুক্ত পরীক্ষা নির্বাচন করতে পারেন।

বর্তমান ADA diagnostic criteria অনুযায়ী HbA1c ৫.৭ থেকে ৬.৪ শতাংশ এবং fasting plasma glucose ১০০ থেকে ১২৫ mg/dL প্রিডায়াবেটিসের সীমার মধ্যে পড়ে।

একটি পরীক্ষার ফল দেখে নিজে থেকে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা উচিত নয়। স্পষ্ট hyperglycemia না থাকলে ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য অস্বাভাবিক ফল সাধারণত নিশ্চিত করার প্রয়োজন হয়।

৩৫ বছরের পর পরীক্ষা করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমান ADA নির্দেশিকা অনুযায়ী অন্য কোনো বিশেষ ঝুঁকি না থাকলেও সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৫ বছর বয়স থেকে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস screening শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তবে অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে পারিবারিক ইতিহাস, উচ্চ রক্তচাপ, PCOS, কম শারীরিক কার্যক্রম বা অন্যান্য ঝুঁকি থাকলে আরও কম বয়সেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

খাবার পরিবর্তন করলে কি উপকার পাওয়া যায়?

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের জন্য কোনো একটি জাদুকরী খাবার নেই। ভাত বা অন্য কোনো একটি খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার পরিবর্তে পুরো খাদ্যাভ্যাস এবং খাবারের পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া বেশি বাস্তবসম্মত।

বাংলাদেশের পরিচিত খাবারের মধ্যে শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মাছ, ডিম, ফল এবং উপযুক্ত পরিমাণে সম্পূর্ণ শস্য রাখা যায়। একই সঙ্গে মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি এবং অত্যধিক প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো উপকারী।

ব্যায়াম কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সাড়া উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। তাই ব্যায়ামের উদ্দেশ্য শুধু শরীরের ওজন কমানো নয়, বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দ্রুত হাঁটা অনেকের জন্য সহজ শুরু হতে পারে। সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত হাঁটা বা অন্যান্য মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা যায়। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকলে হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে ধীরে ধীরে সক্রিয়তা বাড়ানো ভালো।

প্রিডায়াবেটিস মানেই কি ডায়াবেটিস হবেই?

না। প্রিডায়াবেটিস থাকলে ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের ডায়াবেটিস হবেই এমন নয়। বরং এই পর্যায়টি ঝুঁকি শনাক্ত করে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার গুরুত্বপূর্ণ সময়।

খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ওজন, রক্তচাপ এবং রক্তের চর্বির মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। কারও ঝুঁকি বেশি হলে চিকিৎসক ব্যক্তিভেদে আরও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা দিতে পারেন।

শেষ কথা

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স মানেই ডায়াবেটিস নয়, আবার এটি উপেক্ষা করার বিষয়ও নয়। অনেক সময় দৃশ্যমান লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বিপাকীয় পরিবর্তন চলতে পারে।

পরিবারে ডায়াবেটিস থাকা, পেটের অতিরিক্ত চর্বি, উচ্চ রক্তচাপ, PCOS, fatty liver বা কম শারীরিক কার্যক্রমের মতো ঝুঁকি থাকলে সময়মতো পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

Leave a Comment