জ্বর, গলা ব্যথা কিংবা সর্দি হলেই অনেকে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু সব সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা, অন্যের ওষুধ ব্যবহার করা কিংবা আগের অসুস্থতার বেঁচে যাওয়া ওষুধ খাওয়া নিরাপদ অভ্যাস নয়।
ওষুধ নিরাপদভাবে ব্যবহারের আরও তথ্য OneLifeBD এর ঔষধের তথ্য বিভাগে পাওয়া যাবে। অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত ওষুধ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্টিবায়োটিক আসলে কী কাজ করে?
অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কোন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হবে সেটি সংক্রমণের ধরন, রোগীর অবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
CDC এর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নির্দেশনা অনুযায়ী, অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। তাই সাধারণ সর্দি, ফ্লু এবং বেশিরভাগ ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় এটি উপকার করে না।
এমনকি সব ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণেও অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। তাই শুধু জ্বর বা গলা ব্যথা দেখেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।
বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ও স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে OneLifeBD এর রোগ ও স্বাস্থ্য বিভাগে আরও বিস্তারিত স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখা পাওয়া যাবে।
অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে খাওয়া উচিত?
অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্ট যে মাত্রা, সময় এবং সময়কাল নির্ধারণ করেছেন ঠিক সেই নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। নিজের ইচ্ছায় মাত্রা পরিবর্তন করা ঠিক নয়।
NHS এর অ্যান্টিবায়োটিক নির্দেশনা অনুযায়ী, ওষুধের প্যাকেট বা সঙ্গে থাকা তথ্যপত্রের নির্দেশনা অথবা চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টের দেওয়া নিয়ম অনুসারে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত।
কিছু অ্যান্টিবায়োটিক খাবারের সঙ্গে নিতে হয়, আবার কিছু খালি পেটে নেওয়ার নির্দেশ থাকতে পারে। তাই সব অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য একই নিয়ম ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।
ভালো লাগলে মাঝপথে বন্ধ করে দেবেন?
অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করার পর উপসর্গ কমে গেলেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়। আবার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দিন চালিয়ে যাওয়াও সঠিক পদ্ধতি নয়।
মূল নিয়ম হলো চিকিৎসক যে সময়কাল নির্ধারণ করেছেন সেটি অনুসরণ করা। চিকিৎসক পরে চিকিৎসার সময় পরিবর্তন করলে নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।
অর্থাৎ “যেকোনো অবস্থায় প্রতিটি অ্যান্টিবায়োটিক শেষ করতেই হবে” এমন সরল নিয়মের পরিবর্তে চিকিৎসকের নির্ধারিত মাত্রা ও সময়কাল ঠিকভাবে অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ডোজ ভুলে গেলে কী করবেন?
একটি ডোজ ভুলে গেলে কী করতে হবে তা নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই প্রথমে ওষুধের সঙ্গে থাকা তথ্যপত্রের নির্দেশনা দেখা উচিত।
NHS অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মনে পড়লে ভুলে যাওয়া ডোজ নেওয়া যায়। তবে পরবর্তী ডোজের সময় খুব কাছাকাছি হলে বাদ দেওয়া ডোজটি আর নেওয়া উচিত নয়।
ভুলে যাওয়া ডোজ পূরণ করতে একসঙ্গে দ্বিগুণ মাত্রা গ্রহণ করা উচিত নয়। এভাবে কাছাকাছি সময়ে বেশি ওষুধ নিলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী?
অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় এবং ভুল ব্যবহার ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ। তখন আগে কার্যকর থাকা অ্যান্টিবায়োটিক কোনো সংক্রমণে কম কার্যকর হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কিত তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহার বিশ্বব্যাপী antimicrobial resistance বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি।
প্রতিরোধ ক্ষমতা মানুষের শরীরে তৈরি হয় এমন নয়, মূলত জীবাণু প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। সেই প্রতিরোধী জীবাণুর সংক্রমণ হলে চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে কার্যক্রম রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের AMR বিভাগে জাতীয় কৌশল, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নির্দেশনা এবং নজরদারি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত রয়েছে।
তাই পরিচিত কারও পরামর্শে বা আগের প্রেসক্রিপশন দেখে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু না করে উপযুক্ত স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া ব্যক্তিগত ও জনস্বাস্থ্য উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন অভ্যাস এবং রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কিত আরও লেখা OneLifeBD এর জীবনযাপন বিভাগে পাওয়া যাবে।
অন্যের অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে?
একই ধরনের জ্বর বা ব্যথা থাকলেও দুজন মানুষের অসুস্থতার কারণ এক নাও হতে পারে। তাই অন্য ব্যক্তির জন্য দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক নিজের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়।
CDC অন্যের অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ, নিজের ওষুধ অন্যকে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য বেঁচে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক রেখে দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়।
ভুল অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে সঠিক চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হতে পারে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, র্যাশ এবং অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা দরকার?
অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের পর শ্বাসকষ্ট, গলা বা মুখ ফুলে যাওয়া কিংবা গুরুতর অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার মতো সমস্যাও অবহেলা করা উচিত নয়। অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের সময় অস্বাভাবিক বা গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসককে দ্রুত জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
অ্যান্টিবায়োটিক জীবন রক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ, কিন্তু সব জ্বর, সর্দি বা সংক্রমণের চিকিৎসা এটি নয়। প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক, সঠিক মাত্রা এবং নির্ধারিত সময়কাল অনুসরণ করুন। অন্যের ওষুধ, পুরোনো প্রেসক্রিপশন কিংবা বেঁচে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক নিজের সিদ্ধান্তে ব্যবহার করবেন না।
দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শুধু একজন রোগীর নিরাপত্তার জন্য নয়। ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর রাখতেও প্রত্যেকের সচেতন ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।