ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ কী? শুরুতে কীভাবে বুঝবেন এবং কার ঝুঁকি বেশি?

ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ শুরুতে অনেকেরই বোঝা যায় না। লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলেও দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে, ফলে অন্য কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে সমস্যাটি ধরা পড়ে।

বর্তমানে বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভারকে MASLD নামেও উল্লেখ করা হয়। এটি অতিরিক্ত ওজনের পাশাপাশি টাইপ ২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং রক্তে অস্বাভাবিক চর্বির মাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।

লিভারসহ বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে OneLifeBD এর রোগ ও স্বাস্থ্য বিভাগে আরও তথ্য রয়েছে। কোনো লক্ষণ না থাকলেও ঝুঁকির কারণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাটি লিভার আসলে কী?

NIDDK এর ফ্যাটি লিভার সম্পর্কিত তথ্য অনুযায়ী, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ফ্যাটি লিভার হতে পারে। বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত এই অবস্থাকে বর্তমানে MASLD নামেও উল্লেখ করা হয়।

ফ্যাটি লিভারের সাধারণ অবস্থায় শুধু চর্বি জমতে পারে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে লিভারে প্রদাহ ও ক্ষতি দেখা দিতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে আরও গুরুতর সমস্যার দিকে এগোতে পারে।

ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ কী?

ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক মানুষের কোনো লক্ষণই থাকে না। NIDDK এর তথ্য অনুযায়ী, রোগটি সাধারণত নীরব থাকে এবং খুব কম বা কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে।

লক্ষণ দেখা দিলে কারও ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে অথবা পেটের ওপরের ডান দিকে অস্বস্তি থাকতে পারে। তবে শুধু এসব উপসর্গ দেখে নিজে থেকে ফ্যাটি লিভার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এই কারণেই ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন কিংবা বিপাকীয় ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কার ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বেশি?

অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল এবং মেটাবলিক সিনড্রোম থাকলে বিপাকীয় ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।

স্বাস্থ্যকর ওজন ও খাবারের অভ্যাস এই ঝুঁকিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর খাবার সম্পর্কে OneLifeBD এর খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগে আরও ব্যবহারিক তথ্য পাওয়া যাবে।

তবে শুধু অতিরিক্ত ওজনের মানুষেরই ফ্যাটি লিভার হয়, এমন ধারণা ভুল। বাংলাদেশের গবেষণাতেও স্বাভাবিক বা কম ওজনের কিছু মানুষের মধ্যে ফ্যাটি লিভার পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভার কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশে ২,৭৮২ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা একটি জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণায় NAFLD এর হার প্রায় ৩৩.৯ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল। গবেষণাটি শহর ও গ্রাম উভয় এলাকার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

বাংলাদেশের ওই গবেষণায় বয়স বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস এবং বেশি BMI ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত ছিল। উচ্চ রক্তচাপ থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি দেখা গিয়েছিল।

তবে এটি ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের তথ্যের ওপর করা গবেষণা। তাই ৩৩.৯ শতাংশকে বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় হার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

আরেকটি বাংলাদেশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর গবেষণায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ স্থূল ছিলেন না। অর্থাৎ দেখতে রোগা হলেই ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি নেই, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

ফ্যাটি লিভার কীভাবে ধরা পড়ে?

শুধু উপসর্গ দিয়ে ফ্যাটি লিভার নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকেরা রোগীর ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য ইমেজিং পরীক্ষার তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করেন।

NIDDK এর রোগ নির্ণয় নির্দেশনা অনুযায়ী, ALT ও AST এর মতো লিভার এনজাইম পরীক্ষা করা হতে পারে। তবে রক্ত পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক থাকলেও মূল্যায়নের অন্যান্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আল্ট্রাসাউন্ডসহ সাধারণ ইমেজিং পরীক্ষায় লিভারে চর্বি দেখা যেতে পারে। তবে সাধারণ ইমেজিং দিয়ে লিভারে প্রদাহ বা ফাইব্রোসিসের মাত্রা সবসময় নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না।

প্রয়োজন হলে চিকিৎসক FIB 4 এর মতো হিসাব বা elastography ব্যবহার করে লিভারে উল্লেখযোগ্য fibrosis বা দাগ তৈরির ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারেন। সবার ক্ষেত্রে একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না।

ফ্যাটি লিভার থাকলে কী করা যায়?

অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর ওজন কমানো ফ্যাটি লিভার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। হঠাৎ কঠোর ডায়েটের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

NIDDK এর খাদ্য ও পুষ্টি নির্দেশনায় স্বাস্থ্যকর খাবার, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ওজন কমানোর পরামর্শ রয়েছে। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে পরিকল্পনা আলাদা হতে পারে।

নিয়মিত হাঁটা দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সহজ উপায়। OneLifeBD এর প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটার উপকারিতা সম্পর্কিত লেখায় হাঁটার বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা কমিয়ে দৈনন্দিন নড়াচড়া বাড়ানো উপকারী অভ্যাস। OneLifeBD এর ফিটনেস ও ব্যায়াম বিভাগে হাঁটা ও শরীরচর্চা নিয়ে আরও লেখা পাওয়া যাবে।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?

ত্বক বা চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, পেট ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা অন্য গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে শুধু ফ্যাটি লিভার ভেবে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এসব লক্ষণ ফ্যাটি লিভারের সাধারণ প্রাথমিক উপসর্গ নয় এবং অন্য লিভার সমস্যার কারণেও হতে পারে। তাই উপসর্গের কারণ নির্ধারণের জন্য যথাযথ চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।

শেষ কথা

ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ অনেক সময় শুরুতে একেবারেই থাকে না। তাই শুধু শরীরের উপসর্গের ওপর নির্ভর না করে ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাভাবিক রক্তের চর্বি ও অন্যান্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার।

ঝুঁকি থাকলে নিজের সিদ্ধান্তে পরীক্ষা বা ওষুধ শুরু করার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং উপযুক্ত ওজন বজায় রাখা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Comment