উচ্চ রক্তচাপ থাকলে মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরা হবেই, এমন ধারণা অনেকের আছে। বাস্তবে উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। একজন মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করেও বছরের পর বছর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে থাকতে পারেন। এ কারণেই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণাও বিষয়টির গুরুত্ব দেখাচ্ছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশভিত্তিক একটি গবেষণায় ২০২২ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপের ১৩ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপ অথবা ডায়াবেটিসের সম্মিলিত হার ছিল ৩১ শতাংশ। ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে তা ছিল ৫২ শতাংশ।
উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ না থাকলেও বিপদ কেন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই শরীর ভালো লাগছে মানেই রক্তচাপ স্বাভাবিক, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
নিয়ন্ত্রণে না থাকা উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন ধরে রক্তনালি ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এর ফলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
খুব বেশি রক্তচাপ হলে তীব্র মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা হতে পারে। এমন গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি কী বলছে
WHO এর Bangladesh hypertension profile অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের আনুমানিক ২৮ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ ছিল। প্রায় ২ কোটি ২৮ লাখ আক্রান্ত মানুষের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ছিল।
আরেকটি ২০২৬ সালের বাংলাদেশি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২২ সালে উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতনতা, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের হার উন্নত হয়েছে। তারপরও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি ও সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়ে গেছে।
কারা নিয়মিত রক্তচাপ মাপার বিষয়ে বেশি সতর্ক হবেন
বয়স বাড়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে। অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস, কম শারীরিক পরিশ্রম, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এবং তামাক ব্যবহারও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণায়ও বয়স, অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই শুধু অসুস্থ বোধ করলে নয়, ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়িতে রক্তচাপ মাপার সঠিক নিয়ম কী
ভুলভাবে রক্তচাপ মাপলে ফলও ভুল আসতে পারে। CDC এর নির্দেশনা অনুযায়ী, মাপার আগে অন্তত পাঁচ মিনিট শান্তভাবে বসুন। পা মেঝেতে সমানভাবে রাখুন, পা আড়াআড়ি করবেন না এবং পিঠ চেয়ারে ঠেকিয়ে রাখুন।
কাফটি পোশাকের ওপর নয়, খালি বাহুতে লাগাতে হবে এবং হাত বুকের উচ্চতায় রাখতে হবে। রক্তচাপ মাপার সময় কথা বলবেন না। অন্তত দুটি মাপ এক থেকে দুই মিনিটের ব্যবধানে নেওয়া যেতে পারে। একই সময়ে নিয়মিত মাপের হিসাব লিখে রাখলে চিকিৎসকের জন্যও পরিস্থিতি বোঝা সহজ হয়।
উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন
খাবারে লবণ কমানো, বেশি শাকসবজি ও ফল খাওয়া, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং তামাক এড়িয়ে চলা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। WHO প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপের পরামর্শ দেয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লবণ কমানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। WHO এর দেশভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের গড় লবণ গ্রহণ দৈনিক প্রায় ৯ গ্রাম, যা সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি।
তবে জীবনযাপনে পরিবর্তন করলেই সবার ওষুধ বন্ধ করা যাবে, এমন নয়। চিকিৎসক ওষুধ দিলে নিজের সিদ্ধান্তে তা বন্ধ করা, মাত্রা কমানো বা অন্যের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে OneLifeBD এর অ্যান্টিবায়োটিক ও নিজের ইচ্ছায় ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি বিষয়ক লেখাটিও পড়তে পারেন।
লক্ষণের অপেক্ষা নয়, রক্তচাপ মাপুন
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি অনেক সময় নীরবে থাকে। তাই মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে সময়মতো রক্তচাপ পরীক্ষা করাই ভালো।
বিশেষ করে বয়স বাড়লে কিংবা ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা অন্য ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করুন। একটি অস্বাভাবিক মাপ দেখেই নিজে রোগ নির্ণয় বা ওষুধ শুরু করবেন না। ধারাবাহিক ফল ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসক সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন।