কোষ্ঠকাঠিন্য কেন হয়? মুক্তির উপায় ও কোন খাবারগুলো বেশি উপকারী

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায় জানতে হলে প্রথমে সমস্যাটির কারণ বুঝতে হবে। সপ্তাহে তিনবারের কম মলত্যাগ, শক্ত বা শুকনো মল এবং মলত্যাগে অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার প্রয়োজন হলে সেটি কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ হতে পারে।

প্রতিদিন মলত্যাগ না হলেই যে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে, এমন নয়। মানুষের স্বাভাবিক মলত্যাগের অভ্যাসে পার্থক্য থাকে। তবে নিয়মিত কষ্ট হওয়া বা পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি এমন অনুভূতি হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের NIDDK এর কোষ্ঠকাঠিন্য বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে খাবার ও দৈনন্দিন অভ্যাস পরিবর্তন করে সমস্যা কমানো সম্ভব। তবে দীর্ঘদিন সমস্যা চলতে থাকলে এর পেছনের কারণ খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ কী কী?

কোষ্ঠকাঠিন্যের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো স্বাভাবিকের তুলনায় কম মলত্যাগ এবং শক্ত বা শুকনো মল। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হতে পারে এবং কখনো কখনো ব্যথা বা অস্বস্তিও অনুভূত হতে পারে।

অনেকের মলত্যাগের পরও মনে হয় পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। NIDDK এর লক্ষণ ও কারণ বিষয়ক নির্দেশনায় সপ্তাহে তিনবারের কম মলত্যাগসহ এসব সমস্যাকে কোষ্ঠকাঠিন্যের পরিচিত লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোষ্ঠকাঠিন্য কেন হয়?

খাবারে পর্যাপ্ত আঁশ না থাকা, কম তরল গ্রহণ, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং মলত্যাগের চাপ বারবার আটকে রাখা কোষ্ঠকাঠিন্যের সাধারণ কারণ। ভ্রমণ বা দৈনন্দিন রুটিনের পরিবর্তনেও সাময়িকভাবে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কিছু ওষুধ এবং সম্পূরকও কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে। NIDDK এর তথ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যথার ওষুধ, আয়রনের সম্পূরক এবং নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের ওষুধ মলত্যাগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে কোনো ওষুধ গ্রহণের পর কোষ্ঠকাঠিন্য শুরু হয়েছে মনে হলেও নিজের সিদ্ধান্তে সেটি বন্ধ করা উচিত নয়। সমস্যাটি চিকিৎসককে জানালে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, মাত্রা বা অন্য সম্ভাব্য কারণ মূল্যায়ন করতে পারবেন।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায় কী?

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায় হিসেবে প্রথমে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, তরল গ্রহণ এবং শারীরিক সক্রিয়তার দিকে নজর দেওয়া যায়। অধিকাংশ সাধারণ ক্ষেত্রে এসব অভ্যাস ধীরে ধীরে পরিবর্তন করাই সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

একসঙ্গে অনেক পরিবর্তন করার পরিবর্তে খাবারে ধীরে ধীরে আঁশ বাড়ানো, নিয়মিত হাঁটা এবং মলত্যাগের চাপ আটকে না রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কয়েকদিনের পরিবর্তে নিয়মিত এই অভ্যাসগুলো অনুসরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আঁশযুক্ত খাবার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

খাদ্যের আঁশ মলের স্বাভাবিক গঠন বজায় রাখতে এবং অন্ত্রের ভেতর দিয়ে মল চলাচলে সহায়তা করতে পারে। এজন্য কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

NIDDK এর খাদ্য ও পুষ্টি নির্দেশনা অনুযায়ী, বয়স ও লিঙ্গভেদে প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক প্রায় ২২ থেকে ৩৪ গ্রাম আঁশ প্রয়োজন হতে পারে। তবে হঠাৎ খুব বেশি আঁশ খাওয়া শুরু করা উচিত নয়।

খাবারে আঁশের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ালে শরীর নতুন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় পায়। হঠাৎ অনেক বেশি আঁশ গ্রহণ করলে কিছু মানুষের পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তি বাড়তে পারে।

কোন খাবারগুলো বেশি উপকারী?

বাংলাদেশের পরিচিত অনেক খাবার থেকেই সহজে আঁশ পাওয়া সম্ভব। ডাল, ছোলা, বিভিন্ন শিম, শাকসবজি, ফল এবং পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে দৈনিক আঁশের চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে।

আপেল ও নাশপাতির মতো খাওয়ার উপযোগী খোসাযুক্ত ফল, ওটস, ডাল এবং বিভিন্ন সবজি ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন উৎস থেকে আঁশ রাখা ভালো।

সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ভালো রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচনের বিষয়ে OneLifeBD এর ওজন নিয়ন্ত্রণে উপকারী কার্বোহাইড্রেট নিয়ে বিস্তারিত লেখাটি পড়তে পারেন, যেখানে বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবারের ভূমিকা সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

পর্যাপ্ত পানি ও তরল কেন দরকার?

খাবারে আঁশ বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। আঁশ পানি শোষণ করে মলকে তুলনামূলক নরম রাখতে সাহায্য করতে পারে, ফলে অন্ত্রের মধ্য দিয়ে মল চলাচল এবং মলত্যাগ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সহজ হয়।

তবে প্রতিদিন সবার জন্য একই পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয় না। বয়স, শরীরের আকার, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর তরলের প্রয়োজন পরিবর্তিত হতে পারে, তাই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করুন।

নিয়মিত হাঁটাচলা করুন

দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা এবং দৈনন্দিন কাজে শরীরকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করা অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য উপকারী হতে পারে।

NIDDK এর কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা নির্দেশনায় নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড কোষ্ঠকাঠিন্যের উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত সক্রিয় থাকার অভ্যাস গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য।

মলত্যাগের চাপ আটকে রাখবেন না

ব্যস্ততা, বাইরে থাকার অস্বস্তি কিংবা বাথরুম ব্যবহারে অনীহার কারণে অনেকেই মলত্যাগের চাপ দীর্ঘ সময় আটকে রাখেন। নিয়মিত এমন অভ্যাস করলে অন্ত্রের স্বাভাবিক সংকেত উপেক্ষিত হতে পারে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়তে পারে।

চাপ অনুভব করলে সম্ভব হলে বাথরুমে যাওয়ার চেষ্টা করুন। NIDDK সকালের নাশতার প্রায় ১৫ থেকে ৪৫ মিনিট পর মলত্যাগের চেষ্টা করার কথা বলেছে, কারণ খাবারের পর অন্ত্রের স্বাভাবিক নড়াচড়া সক্রিয় হতে পারে।

বাথরুমে বসার ভঙ্গি কেমন হবে?

মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত জোর না দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বসার চেষ্টা করা ভালো। পায়ের নিচে ছোট একটি টুল রেখে হাঁটু নিতম্বের তুলনায় কিছুটা ওপরে রাখলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মলত্যাগ তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

NHS এর কোষ্ঠকাঠিন্য নির্দেশনায় পায়ের নিচে নিচু টুল ব্যবহার করে হাঁটু নিতম্বের ওপরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মলত্যাগের চাপ অনুভব করলে অযথা সেটি আটকে না রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

ইসবগুল কি কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকারী?

ইসবগুল এক ধরনের আঁশ এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে আঁশের সম্পূরক হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়। তবে ইসবগুল গ্রহণের সময় পর্যাপ্ত তরল পান করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আঁশের সঙ্গে শরীরে পর্যাপ্ত তরলও প্রয়োজন হয়।

দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করলে অথবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে নিয়মিত ইসবগুল ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। শুধু ইসবগুলের ওপর নির্ভর করাও সঠিক পদ্ধতি নয়।

জোলাপ কি নিজের ইচ্ছায় ব্যবহার করা উচিত?

খাবার, তরল এবং দৈনন্দিন অভ্যাস পরিবর্তনের পরও সমস্যা না কমলে কিছু ক্ষেত্রে জোলাপ প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব ধরনের জোলাপ একইভাবে কাজ করে না এবং কোনটি প্রয়োজন তা ব্যক্তির অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

NIDDK এর চিকিৎসা নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য পেশাজীবী প্রয়োজন অনুযায়ী স্বল্প সময়ের জন্য উপযুক্ত জোলাপের পরামর্শ দিতে পারেন। দীর্ঘদিন নিজের সিদ্ধান্তে নিয়মিত জোলাপ ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে কি পাইলস হতে পারে?

দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকা এবং মলত্যাগের সময় নিয়মিত অতিরিক্ত চাপ দেওয়া পাইলসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই মল নরম রাখা এবং অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার অভ্যাস পেট ও মলদ্বারের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

NIDDK এর পাইলস বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া পাইলসের সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। তবে মলের সঙ্গে রক্ত দেখলেই পাইলস ধরে নেওয়া উচিত নয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

খাদ্য ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার পরও কোষ্ঠকাঠিন্য না কমলে অথবা সমস্যাটি নিয়মিত ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যের পেছনে কখনো কখনো অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যাও থাকতে পারে।

বিশেষ করে মলের সঙ্গে রক্ত, মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত, একটানা পেটব্যথা, গ্যাস বের করতে না পারা, বমি, জ্বর কিংবা চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমতে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

NIDDK এর নির্দেশনায় এসব সমস্যাকে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে এমন সতর্কসংকেত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুতর উপসর্গ থাকলে শুধু ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহার করে অপেক্ষা না করাই নিরাপদ।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য সহজ কিছু অভ্যাস

বাংলাদেশের পরিচিত খাবারের মধ্যেই পর্যাপ্ত আঁশের অনেক ভালো উৎস রয়েছে। প্রতিদিন ডাল, শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ছোলা এবং পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবারের সমন্বয় করলে আলাদা ব্যয়বহুল খাবার ছাড়াই খাদ্যতালিকায় আঁশ বাড়ানো সম্ভব।

একই সঙ্গে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, নিয়মিত হাঁটা, মলত্যাগের চাপ আটকে না রাখা এবং বাথরুম ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখার অভ্যাস করুন। নিয়মিত ছোট পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে পেটের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।

শেষ কথা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায় হিসেবে প্রথমে খাবার ও দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া উচিত। ধীরে ধীরে আঁশ বাড়ানো, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, নিয়মিত হাঁটাচলা এবং মলত্যাগের চাপ আটকে না রাখা উপকারী হতে পারে।

তবে দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে অথবা রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, বমি, জ্বর কিংবা অকারণে ওজন কমার মতো সতর্কসংকেত দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করাই তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Comment