আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি বা দুর্বলতা ভেবে আমরা এড়িয়ে যাই। সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা, অল্প কাজেই হাঁপিয়ে যাওয়া কিংবা হঠাৎ মাথা ঘোরা শরীরে আয়রনের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে একই ধরনের সমস্যা আরও অনেক কারণেও হতে পারে, তাই শুধু লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
আয়রন শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। শরীর আয়রন ব্যবহার করে হিমোগ্লোবিন তৈরি করে, যা লোহিত রক্তকণিকার মাধ্যমে ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের আয়রন বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, শরীরে জমা আয়রন কমতে কমতে এক পর্যায়ে আয়রনের ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন ক্লান্তি, দুর্বলতা বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যা থাকলে এর কারণ খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের মাধ্যমে আয়রনের ঘাটতি আছে কি না নিশ্চিত করা যায়।
১. অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা
আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ হিসেবে ক্লান্তি ও দুর্বলতা বেশ পরিচিত। শরীরে আয়রনের ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া তৈরি হলে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন না থাকার কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পরিবহন ব্যাহত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ্যানিমিয়া বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ক্লান্তি ও দুর্বলতা অ্যানিমিয়ার সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও যদি দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক ক্লান্তি থাকে এবং দৈনন্দিন কাজে এর প্রভাব পড়ে, তাহলে কারণ খুঁজে দেখা ভালো।
২. মাথা ঘোরা বা হালকা লাগা
হঠাৎ মাথা ঘোরা, মাথা হালকা লাগা বা দাঁড়ানোর সময় অস্বস্তি অ্যানিমিয়ার সঙ্গে দেখা দিতে পারে। তবে মাথা ঘোরার আরও অনেক কারণ রয়েছে। পানিশূন্যতা, রক্তচাপের পরিবর্তন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যাতেও এমন হতে পারে। তাই শুধু মাথা ঘোরার ওপর ভিত্তি করে আয়রনের ঘাটতি ধরে নেওয়া উচিত নয়।
৩. ত্বক বা চোখের ভেতরের অংশ ফ্যাকাশে হওয়া
অ্যানিমিয়া হলে কারও ত্বক, নখের নিচের অংশ বা চোখের নিচের ভেতরের অংশ স্বাভাবিকের তুলনায় ফ্যাকাশে দেখাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ত্বক ও শ্লেষ্মা ফ্যাকাশে হওয়াকে অ্যানিমিয়ার সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে উল্লেখ করেছে। তবে মানুষের স্বাভাবিক ত্বকের রঙ ভিন্ন হওয়ায় শুধু ত্বক দেখে অ্যানিমিয়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
৪. অল্প পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট
আগে যে কাজ সহজে করতে পারতেন, এখন একই কাজ করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছেন? সিঁড়ি ওঠা, দ্রুত হাঁটা বা দৈনন্দিন কাজের সময় অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট অ্যানিমিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমের সময় শ্বাসকষ্ট অ্যানিমিয়ার পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি। তবে হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে এটিকে শুধু আয়রনের সমস্যা ভেবে অপেক্ষা করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
৫. বুক ধড়ফড় বা হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া
অ্যানিমিয়া গুরুতর হলে হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করার সময় হৃদযন্ত্রকে বেশি কাজ করতে হতে পারে। বিশেষ করে বুক ধড়ফড়ের সঙ্গে বুকে ব্যথা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি বা প্রচণ্ড দুর্বলতা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
৬. মাথাব্যথা ও মনোযোগের সমস্যা
আয়রনের ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়ায় কিছু মানুষের মাথাব্যথা হতে পারে। একই সঙ্গে কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা বা আগের তুলনায় মনোযোগের ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। NIH এর আয়রন বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, আয়রনের ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া মনোযোগ ও স্মৃতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
৭. হাত পা ঠান্ডা লাগা
কারও কারও ক্ষেত্রে অ্যানিমিয়ার সঙ্গে হাত ও পা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ্যানিমিয়া বিষয়ক তথ্যেও ঠান্ডা হাত ও পাকে সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আবহাওয়া, রক্ত সঞ্চালন এবং অন্যান্য কারণেও হাত পা ঠান্ডা হতে পারে। তাই এটিকেও এককভাবে আয়রনের ঘাটতির প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
৮. কাজ বা শরীরচর্চার ক্ষমতা কমে যাওয়া
আগের তুলনায় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, শরীরচর্চা করতে কষ্ট হওয়া বা দৈনন্দিন কাজের ক্ষমতা কমে যাওয়াও আয়রনের ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। NIH এর তথ্য অনুযায়ী, আয়রনের ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া কাজ এবং শরীরচর্চার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কেন শরীরে আয়রনের ঘাটতি হয়?
শুধু খাবারে আয়রন কম থাকলেই আয়রনের ঘাটতি হয় না। নিয়মিত রক্তক্ষরণ, অতিরিক্ত মাসিক, গর্ভাবস্থায় আয়রনের চাহিদা বৃদ্ধি এবং পরিপাকতন্ত্রের কিছু সমস্যার কারণে খাবার থেকে আয়রন ঠিকমতো শোষিত না হলেও ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিশু, কিশোরী, মাসিক হয় এমন নারী এবং গর্ভবতী ও সন্তান প্রসবের পরের নারীদের মধ্যে অ্যানিমিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
আয়রনের ঘাটতি জানতে কোন পরীক্ষা করা হয়?
আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ থাকলেও শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক রক্তের হিমোগ্লোবিনসহ বিভিন্ন পরীক্ষা দিতে পারেন।
শরীরে জমা আয়রনের অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে সেরাম ফেরিটিন গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফেরিটিন বিষয়ক নির্দেশিকা অনুযায়ী, শরীরের আয়রনের অবস্থা মূল্যায়নে ফেরিটিন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
তবে সংক্রমণ বা প্রদাহ থাকলে ফেরিটিনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের মাধ্যমে সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অ্যানিমিয়া নির্ধারণে হিমোগ্লোবিনও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হিমোগ্লোবিন ব্যবহার করে অ্যানিমিয়া নির্ধারণের হালনাগাদ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার কী কী?
খাবারের মাধ্যমে আয়রন পেতে মাংস, মাছ, ডাল, শিমজাতীয় খাবার এবং বিভিন্ন শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। আয়রন যোগ করা খাবার থেকেও এই খনিজ পাওয়া যায়।
উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা আয়রন শরীর তুলনামূলক কম শোষণ করে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে উদ্ভিজ্জ আয়রনের উৎস খেলে এর শোষণ বাড়তে পারে।
শুধু একটি পুষ্টি উপাদান নয়, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার বিষয়ে OneLifeBD এর ওজন নিয়ন্ত্রণে উপকারী কার্বোহাইড্রেট নিয়ে লেখাটিও পড়তে পারেন।
নিজের ইচ্ছায় আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া কি ঠিক?
ক্লান্তি বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখে নিজের ইচ্ছায় আয়রন ট্যাবলেট শুরু করা ঠিক নয়। কারণ সব ধরনের অ্যানিমিয়া আয়রনের ঘাটতির কারণে হয় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আয়রনের ঘাটতি অ্যানিমিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও ফোলেট, ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন এ এর ঘাটতি, সংক্রমণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং বংশগত কিছু সমস্যাও অ্যানিমিয়ার কারণ হতে পারে।
তাই কারণ নিশ্চিত না করে শুধু আয়রন গ্রহণ করলে প্রকৃত স্বাস্থ্য সমস্যাটি অজানা থেকে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কথা
বাংলাদেশে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতাকে অনেক সময় সাধারণ সমস্যা মনে করে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা হয়। বিশেষ করে কিশোরী, মাসিক হয় এমন নারী এবং গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ দেখা গেলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
খাদ্যতালিকায় ডাল, মাছ, মাংস ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে শরীরে সত্যিই আয়রনের ঘাটতি হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করানোই ভালো।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ফ্যাকাশে ভাব বা পরিশ্রমের সময় শ্বাসকষ্ট থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আর তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক দ্রুত হৃদস্পন্দনের মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা
আয়রনের ঘাটতি ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে এবং শুরুতে এর লক্ষণ খুব স্পষ্ট নাও হতে পারে। ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ফ্যাকাশে ভাব, শ্বাসকষ্ট এবং কাজে মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে আয়রনের ঘাটতির লক্ষণ অন্য অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গেও মিলতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী হিমোগ্লোবিন, ফেরিটিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে অন্যান্য পরীক্ষা করানো ভালো।