শিশুর হাম কীভাবে চিনবেন? লক্ষণ, টিকা ও বাবা মায়ের করণীয়

শিশুর গায়ে হঠাৎ লালচে ফুসকুড়ি উঠলে অনেক বাবা মা প্রথমে অ্যালার্জি বা গরমের সমস্যা মনে করতে পারেন। কিন্তু জ্বরের সঙ্গে কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে মুখ থেকে শরীরের নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়া ফুসকুড়ি দেখা দিলে শিশুর হাম হওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে সময়মতো টিকাদান হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষার উপায়গুলোর একটি।

শিশুর হামের প্রথম লক্ষণ কী

হামের লক্ষণ সাধারণত ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে শুরু হয়। প্রথম দিকে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল ও পানি পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগও দেখা যেতে পারে, যেগুলো Koplik spots নামে পরিচিত।

CDC এর হামের লক্ষণ বিষয়ক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই প্রাথমিক লক্ষণের কয়েক দিন পর সাধারণত ফুসকুড়ি দেখা দেয়। WHO এর তথ্য অনুযায়ী, ফুসকুড়ি সাধারণত মুখ ও ঘাড়ের ওপরের অংশ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে বুক, শরীর, হাত এবং পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

গায়ে ফুসকুড়ি উঠলেই কি হাম হয়েছে

না। শিশুর শরীরে ফুসকুড়ি হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। বিভিন্ন ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, অ্যালার্জি এবং ত্বকের সমস্যাতেও ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তাই শুধু ফুসকুড়ি দেখে বাড়িতে হাম নিশ্চিত করার চেষ্টা করা ঠিক নয়।

জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আবার বাংলাদেশে জ্বরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ডেঙ্গু। তাই জ্বরের ধরন ও অন্যান্য লক্ষণ বুঝতে OneLifeBD এর ডেঙ্গুর বিপদের লক্ষণ এবং কখন হাসপাতালে যাবেন লেখাটিও পড়তে পারেন।

হাম কীভাবে ছড়ায়

হাম বাতাসের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নেওয়া, কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন।

UNICEF Bangladesh এর হাম বিষয়ক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশের বাতাস ও কোনো পৃষ্ঠে ভাইরাস প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এ কারণেই পরিবার, স্কুল বা ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শিশুর হাম সন্দেহ হলে তাকে অন্য শিশু এবং অসুস্থ হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে দূরে রাখুন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার আগে সম্ভব হলে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ফোন করে হাম সন্দেহের কথা জানানো ভালো। এতে অন্য রোগীদের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করা সহজ হয়।

কোন শিশুর হামে জটিলতার ঝুঁকি বেশি

হামকে শুধু জ্বর ও ফুসকুড়ির রোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। WHO বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হামের জটিলতার ঝুঁকি বেশি। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, বিশেষ করে যাদের ভিটামিন A এর ঘাটতি রয়েছে এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ঝুঁকিও বেশি হতে পারে।

হামের জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ, গুরুতর ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা, দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি এবং এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ থাকতে পারে। হামে মৃত্যুর বড় কারণও মূলত এসব জটিলতা।

কোন লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে

হাম সন্দেহ হলে শুরুতেই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। আর শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, অস্বাভাবিকভাবে দুর্বল বা নিস্তেজ হয়ে গেলে, খিঁচুনি হলে, পর্যাপ্ত পানি বা তরল গ্রহণ করতে না পারলে কিংবা অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

হামের কারণে ডায়রিয়া হলে ছোট শিশুর শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে। তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে OneLifeBD এর কলেরা ও তীব্র ডায়রিয়ায় করণীয় লেখাটি পড়তে পারেন।

হামের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ কী

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে টিকাদান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হামের টিকা নিরাপদ ও কার্যকর এবং শিশুর সুরক্ষার জন্য দুই ডোজ টিকা গুরুত্বপূর্ণ। WHO এর হিসাবে ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদান বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ মৃত্যু প্রতিরোধ করেছে

বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হাম ও রুবেলার টিকা রয়েছে। UNICEF Bangladesh এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় Expanded Programme on Immunization এর আওতায় শিশুদের MR টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাস এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।

হামের টিকা মিস হলে বাবা মায়ের করণীয়

শিশুর নির্ধারিত টিকা মিস হয়ে গেলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে বিষয়টি ফেলে রাখাও উচিত নয়। শিশুর টিকা কার্ড নিয়ে নিকটস্থ সরকারি টিকাদান কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা যোগ্য স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। শিশুর বয়স এবং আগে নেওয়া টিকার তথ্য দেখে পরবর্তী করণীয় জানানো যাবে।

নিজে থেকে নতুন টিকার সময়সূচি তৈরি না করে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির নির্দেশনা অনুসরণ করাই নিরাপদ। UNICEF Bangladesh এর অভিভাবকদের জন্য নির্দেশনাতেও শিশুর টিকার সময় জানতে জাতীয় টিকাদান সূচি বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।

শিশুর টিকাদান, পুষ্টি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখা OneLifeBD এর মা ও শিশু বিভাগে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে হাম নিয়ে কেন সতর্ক থাকা জরুরি

বাংলাদেশে ২০২৬ সালে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর সরকার জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে। UNICEF Bangladesh এর তথ্য অনুযায়ী, ৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ১৮টি উচ্চ ঝুঁকির জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী ১২ লাখের বেশি শিশুকে সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে জরুরি হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারিত করা হয়।

এই পরিস্থিতির পেছনে টিকাদানের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ। UNICEF এর বাংলাদেশ বিষয়ক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বিতীয় ডোজ MR টিকার কভারেজ কমে যাওয়ায় অনেক শিশু হামের ঝুঁকিতে থেকে গেছে। তাই শুধু প্রাদুর্ভাবের সময় নয়, নিয়মিত টিকাদানের সময়সূচি অনুসরণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাম হলে শিশুর যত্ন কীভাবে নেবেন

হামের জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই যা ভাইরাসটিকে সরাসরি নির্মূল করে। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও তরল দেওয়া এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত তার চিকিৎসা করা।

UNICEF Bangladesh শিশুকে পর্যাপ্ত তরল দেওয়া, পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যাওয়া এবং বুকের দুধ খাওয়া শিশু হলে বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ডায়রিয়া বা বমির কারণে পানিশূন্যতার ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ORS প্রয়োজন হতে পারে।

WHO হামে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে ভিটামিন A ব্যবহারেরও সুপারিশ করে। তবে এর ডোজ বয়স ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, তাই নিজের সিদ্ধান্তে শিশুকে উচ্চ মাত্রার ভিটামিন A বা অন্য কোনো ওষুধ না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই নিরাপদ।

শিশুকে হাম থেকে সুরক্ষিত রাখতে যা মনে রাখবেন

হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও টিকার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই শিশুর টিকার কার্ড নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং নির্ধারিত কোনো ডোজ বাদ পড়লে যত দ্রুত সম্ভব স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

একই সঙ্গে জ্বর ও ফুসকুড়িকে অবহেলা করবেন না। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, গুরুতর পানিশূন্যতা বা শিশুর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন। সময়মতো টিকা, সঠিক তথ্য এবং দ্রুত চিকিৎসাই শিশুকে হামের গুরুতর জটিলতা থেকে রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

Leave a Comment