ডায়াবেটিসের লক্ষণ কী? কখন রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা জরুরি

ডায়াবেটিসের লক্ষণ শুরুতে অনেক সময় সাধারণ শারীরিক সমস্যার মতো মনে হতে পারে। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা কিংবা কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। আবার বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকলে হৃদযন্ত্র, কিডনি, চোখ, স্নায়ু ও রক্তনালীর ক্ষতি হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণের অপেক্ষা না করে নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন হলে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিসের শুরুর লক্ষণ কী কী

ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা ক্ষুধা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা এবং অকারণে ওজন কমে যাওয়া। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে এসব লক্ষণ দ্রুত দেখা দিতে পারে। কিন্তু টাইপ ২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনেক সময় এতটাই হালকা হয় যে কয়েক বছর পর্যন্ত তা নজরে নাও আসতে পারে।

এই কারণেই শরীর ভালো লাগছে মানেই রক্তে শর্করা স্বাভাবিক, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। WHO এর ২০২৬ সালের World Diabetes Day তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ডায়াবেটিস নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের ৪০ শতাংশের বেশি এখনো রোগটি শনাক্ত হওয়ার বাইরে রয়েছেন।

কখন রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা প্রয়োজন

অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, ঝাপসা দেখা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা কারণ ছাড়াই ওজন কমার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করার পরীক্ষা দিতে পারেন।

তবে শুধু লক্ষণ থাকলেই পরীক্ষা করতে হবে এমন নয়। বয়স, অতিরিক্ত ওজন, পারিবারিক ইতিহাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণ বিবেচনায় লক্ষণ না থাকলেও পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে OneLifeBD এর প্রতিদিন কত মিনিট হাঁটা উচিত লেখাটি পড়তে পারেন।

কোন পরীক্ষায় ডায়াবেটিস শনাক্ত করা হয়

ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকেরা fasting plasma glucose এবং oral glucose tolerance test সহ বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা ব্যবহার করতে পারেন। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে তা ব্যক্তির অবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। WHO বলছে, রক্তে গ্লুকোজ পরিমাপের মাধ্যমে ডায়াবেটিস তুলনামূলক সহজ ও কম খরচে শনাক্ত করা সম্ভব।

বাড়ির glucometer এ একবার রক্তে শর্করা বেশি দেখলেই নিজে থেকে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা ঠিক নয়। একইভাবে অন্য কারও ডায়াবেটিসের ওষুধ নিজের সিদ্ধান্তে শুরু করাও নিরাপদ নয়। অস্বাভাবিক ফল পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করানো উচিত।

ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ কেন গুরুত্বপূর্ণ

দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হৃদযন্ত্র, কিডনি, চোখ, স্নায়ু এবং রক্তনালীর ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া এবং দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এ কারণে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় শুধু রক্তে শর্করার দিকে নজর দিলেই হয় না। রক্তচাপসহ অন্যান্য cardiovascular risk factor এর দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ এবং কখন রক্তচাপ মাপা জরুরি লেখাটি পড়তে পারেন।

খাবার ও দৈনন্দিন অভ্যাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং তামাক এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয় WHO। প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপের কথাও বলা হয়েছে।

তবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ মানেই সব ধরনের শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট খাবার থেকে বাদ দেওয়া নয়। খাবারের সামগ্রিক গুণমান, পরিমাণ এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আরও লেখা OneLifeBD এর খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস নিয়ে সচেতনতা কেন প্রয়োজন

বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস গুরুত্বপূর্ণ অসংক্রামক রোগগুলোর একটি। WHO প্রকাশিত Bangladesh STEPS 2018 জাতীয় জরিপে রক্তে শর্করা, রক্তচাপসহ গুরুত্বপূর্ণ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করা হয়েছিল। WHO এর বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রকাশনাতেও ডায়াবেটিসকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ NCD burden এর অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই কারণে লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষায় থাকার চেয়ে নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস বা অন্য ঝুঁকি থাকলে কখন পরীক্ষা করা প্রয়োজন তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো।

ডায়াবেটিসের লক্ষণ না থাকলেও সতর্ক থাকুন

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের বড় সমস্যা হলো এটি নীরবে এগোতে পারে। তাই “আমার কোনো লক্ষণ নেই, আমার ডায়াবেটিস নেই” এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়। ঝুঁকি থাকলে উপযুক্ত সময়ে পরীক্ষা রোগটি দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।

ডায়াবেটিস শনাক্ত হলেও সঠিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এর অনেক জটিলতা প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব।

Leave a Comment