অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষতি সম্পর্কে না জেনে অনেকেই জ্বর, গলা ব্যথা, সর্দি বা কাশি হলেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। আবার আগের চিকিৎসার সময় বেঁচে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক নতুন অসুখে ব্যবহার করেন কেউ কেউ। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া বা ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে বর্তমান অসুস্থতার পাশাপাশি ভবিষ্যতের চিকিৎসাতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে এই ঝুঁকি কমাতে অ্যান্টিবায়োটিকের প্যাকেটে বিশেষ লাল চিহ্ন ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। WHO Bangladesh এর তথ্য অনুযায়ী, এই চিহ্নের উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে অ্যান্টিবায়োটিক সহজে শনাক্ত করা এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা।
অ্যান্টিবায়োটিক আসলে কী কাজ করে
অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। রোগীর কী ধরনের সংক্রমণ হয়েছে, কোন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন, কত মাত্রায় এবং কতদিন ব্যবহার করতে হবে, তা চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করেন।
সব ধরনের সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। বিশেষ করে ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। তাই সর্দি, কাশি বা জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন এমন ধারণা সঠিক নয়।
অ্যান্টিবায়োটিকের লাল চিহ্নের অর্থ কী
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক সহজে চেনানোর জন্য ওষুধের মোড়কে লাল পরিচিতি চিহ্ন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। WHO Bangladesh জানিয়েছে, মানুষের ও প্রাণীর জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের মোড়কে লাল চিহ্নের পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে পরিচিতি এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ব্যবহার না করার বার্তা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ এই লাল চিহ্নকে সাধারণ কোনো নকশা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ওষুধটি নিজের সিদ্ধান্তে ব্যবহার না করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষতি কেন ভবিষ্যতের চিকিৎসাকেও কঠিন করতে পারে
অপ্রয়োজনে বা ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। মানুষের শরীর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে যায় না, বরং জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। তখন আগে যে ওষুধে কোনো সংক্রমণের চিকিৎসা করা যেত, সেই ওষুধটি পরবর্তীতে ওই প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর নাও হতে পারে।
এর ফলে সংক্রমণের চিকিৎসা কঠিন হতে পারে, অসুস্থতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং বিকল্প চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
ভালো লাগলে কি অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করে দেবেন
চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিলে নিজের সিদ্ধান্তে এর মাত্রা বা ব্যবহারের সময় কমানো কিংবা বাড়ানো উচিত নয়। চিকিৎসক যে নিয়মে ব্যবহার করতে বলেছেন সেটিই অনুসরণ করা প্রয়োজন।
একইভাবে আগের অসুস্থতার সময় বেঁচে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক পরে নিজের সিদ্ধান্তে ব্যবহার করা উচিত নয়। পরিবারের অন্য সদস্যের জন্য দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিকও নিজের জন্য ব্যবহার করবেন না। দেখতে একই ধরনের অসুস্থতা মনে হলেও এর কারণ ভিন্ন হতে পারে।
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে সচেতনতা কেন জরুরি
অ্যান্টিবায়োটিকের ভুল ব্যবহার বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। WHO Bangladesh প্রকাশিত তথ্যে বাংলাদেশের ওষুধ বিক্রেতাদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ মোকাবিলায় জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষের ভুল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব অন্য মানুষের চিকিৎসার ওপরও পড়তে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের আগে কী করবেন
জ্বর, গলা ব্যথা, কাশি বা অন্য কোনো সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলেই নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না। প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিলে কোন ওষুধ, কত মাত্রায় এবং কতদিন ব্যবহার করতে বলেছেন তা অনুসরণ করুন।
ওষুধ ব্যবহারের সময় কোনো অস্বাভাবিক সমস্যা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে নিজের সিদ্ধান্তে অন্য অ্যান্টিবায়োটিক শুরু না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
OneLifeBD এর ওষুধের তথ্য বিভাগে ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কিত আরও সচেতনতামূলক লেখা পড়তে পারেন।
আজকের সচেতনতাই ভবিষ্যতের সুরক্ষা
অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র। কিন্তু অপ্রয়োজনে ব্যবহার করলে সেই গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কার্যকারিতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ওষুধের প্যাকেটে লাল চিহ্ন দেখলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার না করার সতর্কবার্তাটি মনে রাখুন।
নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করা নিজের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করতে পারে।