গর্ভাবস্থায় ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনেকেরই হয়। কিন্তু অতিরিক্ত দুর্বল লাগা, মাথা ঘোরা বা সহজেই হাঁপিয়ে যাওয়ার পেছনে গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা থাকতে পারে। বিশেষ করে শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি ব্যাহত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। UNICEF Bangladesh জানিয়েছে, গর্ভবতী নারী ও ছোট শিশুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি এখনও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। মাতৃ রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। (UNICEF)
গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা কেন হতে পারে
গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়ে এবং গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ও নিজের প্রয়োজন মেটাতে অতিরিক্ত আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয়। খাবার ও প্রয়োজনীয় সম্পূরক থেকে পর্যাপ্ত আয়রন না পেলে আয়রনের ঘাটতি এবং পরবর্তীতে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বজুড়ে ৪০ শতাংশের বেশি গর্ভবতী নারী রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয় এবং এর অন্তত অর্ধেক আয়রনের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত। (World Health Organization)
গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতার লক্ষণ কী
রক্তস্বল্পতা হালকা হলে শুরুতে স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে। সমস্যা বাড়লে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, ফ্যাকাশে ভাব, বুক ধড়ফড় করা বা স্বাভাবিক কাজেই হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ শুধু রক্তস্বল্পতার কারণেই হয় না। তাই লক্ষণ দেখে নিজে থেকে আয়রনের ওষুধ শুরু না করে গর্ভকালীন নিয়মিত পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে রক্তস্বল্পতা পরীক্ষা করা হয়
গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা আছে কি না জানতে রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। WHO এর গর্ভকালীন পরিচর্যার নির্দেশনায় রক্তস্বল্পতা নির্ণয়ের জন্য পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা ব্যবহারের পরামর্শ রয়েছে। এটি সম্ভব না হলে উপযুক্ত যন্ত্রের সাহায্যে হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করা যেতে পারে। (NCBI)
তাই গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাদ দেওয়া ঠিক নয়। কখন পরীক্ষা করতে হবে এবং ফল অনুযায়ী কী ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেটি চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নির্ধারণ করবেন।
আয়রনের ঘাটতি হলে কী খাবেন
দৈনন্দিন খাবারে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উপকারী। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, ছোলা, শিম ও বিভিন্ন গাঢ় সবুজ শাক খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। বাংলাদেশের সাধারণ খাবারের মধ্যেই এসবের অনেকগুলো পাওয়া যায়।
উদ্ভিজ্জ খাবারের আয়রন শরীর তুলনামূলক কম শোষণ করে। তাই ডাল বা শাকসবজির সঙ্গে পেয়ারা, কমলা, লেবু, টমেটো বা অন্য ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রাখা আয়রন শোষণে সহায়তা করতে পারে।
তবে শুধু খাবারের মাধ্যমে গর্ভাবস্থার বাড়তি আয়রনের প্রয়োজন সবসময় পূরণ নাও হতে পারে।
আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড কেন গুরুত্বপূর্ণ
WHO গর্ভবতী নারীদের জন্য প্রতিদিন ৩০ থেকে ৬০ মিলিগ্রাম মৌলিক আয়রন এবং ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণের সুপারিশ করে। এর উদ্দেশ্য মাতৃ রক্তস্বল্পতা, আয়রনের ঘাটতি, কম ওজন নিয়ে জন্ম এবং সময়ের আগে সন্তান জন্মের ঝুঁকি কমানো। ফলিক অ্যাসিড গর্ভধারণের যত দ্রুত সম্ভব, আদর্শভাবে গর্ভধারণের আগেই শুরু করার কথাও WHO বলেছে। (World Health Organization)
তবে কার কতটুকু প্রয়োজন তা নিজের মতো নির্ধারণ করা উচিত নয়। আগে থেকেই রক্তস্বল্পতা থাকলে চিকিৎসার মাত্রা আলাদা হতে পারে। তাই চিকিৎসক বা গর্ভকালীন সেবা প্রদানকারীর দেওয়া আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের পরামর্শ অনুসরণ করাই নিরাপদ।
আয়রনের ট্যাবলেট খেয়ে সমস্যা হলে কী করবেন
আয়রনের ওষুধে কারও কারও বমি বমি ভাব, পেটের অস্বস্তি বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এসব কারণে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জানানো ভালো। প্রয়োজন হলে তারা গ্রহণের সময় বা ওষুধের ধরন নিয়ে উপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারবেন।
গর্ভাবস্থায় কোনো ওষুধ বা সম্পূরক নিজের সিদ্ধান্তে শুরু বা বন্ধ না করাই ভালো।
মা ও শিশুর জন্য সময়মতো যত্ন জরুরি
গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা অবহেলা করার বিষয় নয়। WHO এর তথ্য অনুযায়ী, গর্ভকালীন আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ মাতৃ রক্তস্বল্পতা ও আয়রনের ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি কম ওজন নিয়ে জন্ম এবং সময়ের আগে সন্তান জন্মের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। (World Health Organization)
সুষম খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত গর্ভকালীন পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ এবং প্রয়োজনমতো হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
OneLifeBD এর মা ও শিশু বিভাগে গর্ভাবস্থা, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর যত্ন সম্পর্কিত আরও তথ্য পড়তে পারেন।