শিশুর জ্বর হলে করণীয় কী? কখন হাসপাতালে নিতে হবে জানুন

শিশুর জ্বর হলে করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রত্যেক বাবা মায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ জ্বর সাধারণ সংক্রমণের কারণে হলেও শিশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং সঙ্গে থাকা অন্য লক্ষণগুলো বিশেষভাবে খেয়াল করতে হয়।

শুধু কপালে হাত দিয়ে শিশুর জ্বরের মাত্রা বোঝা নির্ভরযোগ্য নয়। ডিজিটাল থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা ভালো। সাধারণভাবে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রাকে জ্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সাধারণ অসুস্থতা সম্পর্কে আরও প্রয়োজনীয় তথ্য OneLifeBD এর মা ও শিশু বিভাগে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে অসুস্থতার লক্ষণ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

শিশুর জ্বর কেন হয়?

জ্বর নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং শরীরের একটি প্রতিক্রিয়া। সর্দি, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণে শিশুর তাপমাত্রা বাড়তে পারে। কিছু টিকা নেওয়ার পরও সাময়িক জ্বর দেখা দিতে পারে।

NHS এর শিশুদের জ্বর সম্পর্কিত নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুদের জ্বরের একটি সাধারণ কারণ সংক্রমণ। তাই শুধু তাপমাত্রার সংখ্যা নয়, শিশুর আচরণ ও অন্যান্য উপসর্গও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

তিন মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর হলে করণীয় কী?

তিন মাসের কম বয়সী শিশুর তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন। শিশুকে দেখতে মোটামুটি স্বাভাবিক মনে হলেও এই বয়সে জ্বরকে অবহেলা করা উচিত নয়।

NICE এর শিশুদের জ্বরের নির্দেশিকায় তিন মাসের কম বয়সী শিশুর ৩৮ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপমাত্রাকে গুরুতর অসুস্থতার উচ্চ ঝুঁকির লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তাই এই বয়সের শিশুর জ্বর হলে ঘরে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার পরিবর্তে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। নিজের সিদ্ধান্তে জ্বরের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা মূল্যায়ন বিলম্বিত করা ঠিক নয়।

তিন থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে কী করবেন?

তিন থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুর তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। NICE এটিকে গুরুতর অসুস্থতার অন্তত মধ্যবর্তী ঝুঁকির একটি নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করে।

তবে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রির নিচে থাকলেও শিশু অস্বাভাবিক নিস্তেজ, খেতে অনিচ্ছুক বা শ্বাস নিতে কষ্ট করলে অপেক্ষা করবেন না। তাপমাত্রার সংখ্যার পাশাপাশি শিশুর সামগ্রিক অবস্থাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত?

জ্বরের সঙ্গে শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, খুব দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুক ভেতরের দিকে দেবে যাওয়া বা শ্বাসের সময় অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে।

শিশুকে জাগানো কঠিন হলে, স্বাভাবিকভাবে সাড়া না দিলে, অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে গেলে অথবা বিভ্রান্ত মনে হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে শুধু জ্বর কমে কি না দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন না।

জ্বরের সঙ্গে প্রথমবার খিঁচুনি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া অথবা চাপ দিলে মিলিয়ে যায় না এমন লাল বা বেগুনি র‍্যাশ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

WHO এর শিশুস্বাস্থ্য নির্দেশনায় খিঁচুনি, পান করতে না পারা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম বা অচেতন অবস্থা এবং সবকিছু বমি করে দেওয়ার মতো উপসর্গকে গুরুত্বপূর্ণ বিপদের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পানিশূন্যতার লক্ষণ খেয়াল করুন

জ্বরের সময় শরীর থেকে তরল কমে যেতে পারে। শিশু স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম প্রস্রাব করলে, মুখ শুকিয়ে গেলে, চোখ বসে গেলে অথবা কান্নার সময় চোখে পানি না এলে পানিশূন্যতার আশঙ্কা থাকতে পারে।

শিশু বুকের দুধ খেলে নিয়মিত বুকের দুধ দেওয়ার চেষ্টা করুন। বড় শিশু হলে বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত তরল দিন। কিন্তু শিশু পান করতে না পারলে বা বারবার সবকিছু বমি করলে চিকিৎসা সহায়তা নিন।

শিশুর খাবার ও পুষ্টি সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য OneLifeBD এর খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগ পড়তে পারেন। অসুস্থ অবস্থায় শিশুর বয়স অনুযায়ী খাবার ও তরলের প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।

জ্বর হলে ঘরে কী করবেন?

শিশুকে আরামদায়ক পরিবেশে রাখুন এবং অতিরিক্ত কাপড় বা কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখবেন না। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করুন এবং নিয়মিত শিশুর আচরণ, শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রস্রাব ও অন্যান্য নতুন উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করুন।

জ্বর কমানোর উদ্দেশ্য শুধু থার্মোমিটারের সংখ্যা স্বাভাবিক করা নয়। শিশু অস্বস্তিতে থাকলে বয়স ও ওজন অনুযায়ী উপযুক্ত ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, তবে ডোজ সম্পর্কে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের নির্দেশনা অনুসরণ করা নিরাপদ।

OneLifeBD এর প্যারাসিটামল খাওয়ার নিয়ম সম্পর্কিত লেখায় ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের ডোজ অনুসরণ করা কখনোই ঠিক নয়।

জ্বর কমাতে ঠান্ডা পানি বা বরফ ব্যবহার করবেন?

শিশুর জ্বর কমানোর জন্য বরফ, খুব ঠান্ডা পানি বা অ্যালকোহল দিয়ে শরীর মুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। American Academy of Pediatrics এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়।

American Academy of Pediatrics এর নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুকে আরামদায়ক পোশাক পরানো এবং পর্যাপ্ত তরল দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর অস্বস্তি থাকলে উপযুক্ত ওষুধ সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

জ্বর কতদিন থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে কারণ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পাঁচ দিন বা তার বেশি সময় জ্বর থাকলে NICE চিকিৎসা মূল্যায়নের পরামর্শ দেয়, কারণ দীর্ঘস্থায়ী জ্বরের ক্ষেত্রে অন্যান্য রোগের সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হয়।

তবে পাঁচ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার নিয়ম নেই। শিশুর অবস্থা খারাপ হতে থাকলে, খাওয়া কমে গেলে, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা বা অন্য বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে তার আগেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

শুধু জ্বরের মাত্রা দেখে ভয় পাবেন না

ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে শুধু শরীরের তাপমাত্রা কত বেশি, সেটি দিয়ে গুরুতর অসুস্থতা নির্ধারণ করা যায় না। শিশুর আচরণ, শ্বাসপ্রশ্বাস, খাওয়া, পান করা এবং সাড়া দেওয়ার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বর কিছুটা কমার পর শিশু যদি স্বাভাবিকভাবে কথা বলে, খেলতে চায় এবং তরল গ্রহণ করে, সেটি তুলনামূলক আশ্বস্ত করার মতো। তবে নতুন বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে আবার দ্রুত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

শেষ কথা

শিশুর জ্বর হলে করণীয় নির্ভর করে তার বয়স এবং অন্যান্য উপসর্গের ওপর। তিন মাসের কম বয়সে ৩৮ ডিগ্রি বা বেশি এবং তিন থেকে ছয় মাসে ৩৯ ডিগ্রি বা বেশি তাপমাত্রাকে বিশেষ গুরুত্ব দিন।

শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, ঘাড় শক্ত হওয়া, পানিশূন্যতা অথবা চাপ দিলে না মিলানো র‍্যাশ দেখা দিলে ঘরে অপেক্ষা না করে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।

Leave a Comment