আদা বাংলাদেশের রান্নাঘরের খুব পরিচিত একটি উপাদান। চা থেকে শুরু করে তরকারি, স্যুপ কিংবা ঘরোয়া পানীয়েও আমরা আদা ব্যবহার করি। আবার বমি বমি ভাব, পেটের অস্বস্তি বা হজমের সমস্যা হলে অনেকেই আদা খাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আদা কি সত্যিই এসব সমস্যায় কাজ করে?
গবেষণায় আদার কিছু সম্ভাব্য উপকারের প্রমাণ পাওয়া গেলেও সব প্রচলিত দাবির পক্ষে সমান শক্ত প্রমাণ নেই। তাই আদাকে ওষুধের বিকল্প না ভেবে খাবারের একটি উপকারী উপাদান হিসেবে দেখাই ভালো।
বমি বমি ভাব কমাতে আদা কতটা কার্যকর?
আদা নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে বমি বমি ভাব ও বমির ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের National Center for Complementary and Integrative Health বা NCCIH জানিয়েছে, গর্ভাবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বমি বমি ভাব ও বমির ক্ষেত্রে আদা কিছুটা উপকারী হতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করেও একই ধরনের সম্ভাবনা দেখা গেছে। PubMed এ প্রকাশিত ২০২৪ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় গর্ভাবস্থাজনিত বমি বমি ভাবসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে আদার সম্ভাব্য উপকারের কথা বলা হয়েছে। তবে গবেষণাগুলোর মান সব ক্ষেত্রে সমান ছিল না।
তাই বমি বমি ভাব হলেই আদা চিকিৎসার বিকল্প, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
গাড়ি বা বাসে বমি বমি ভাব হলে?
অনেকেই ভ্রমণের সময় বমি বমি ভাব কমাতে আদা খান। কিন্তু এই ক্ষেত্রে গবেষণার ফল ততটা শক্তিশালী নয়।
NCCIH এর তথ্য অনুযায়ী, মোশন সিকনেস বা চলন্ত গাড়ি, বাস কিংবা নৌযানে হওয়া বমি বমি ভাবের ক্ষেত্রে অধিকাংশ গবেষণায় আদার স্পষ্ট উপকার প্রমাণিত হয়নি। তাই ভ্রমণের সময় বমির সমস্যা গুরুতর হলে শুধু আদার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
হজমের জন্য আদা কি ভালো?
আদা বহুদিন ধরে পেটের অস্বস্তি ও হজমের সমস্যায় ব্যবহার হয়ে আসছে। কিছু গবেষণায় আদার সঙ্গে পরিপাকতন্ত্রের কার্যক্রমের সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেলেও সাধারণ বদহজম সারানোর জন্য আদাকে নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে বলার মতো প্রমাণ এখনো যথেষ্ট নয়।
পেট ফাঁপা, বুকজ্বালা, পেটে ব্যথা বা বদহজম বারবার হলে কারণ খুঁজে বের করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের সমস্যা শুধু ঘরোয়া উপায়ে সামলানোর চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আদা কীভাবে খাবেন?
বাংলাদেশের দৈনন্দিন খাবারে অল্প পরিমাণ আদা রান্নায় ব্যবহার করাই সবচেয়ে সহজ উপায়। চাইলে গরম পানিতে সামান্য তাজা আদার টুকরা দিয়ে পানীয় হিসেবেও নেওয়া যায়।
তবে স্বাস্থ্য উপকার পাওয়ার আশায় প্রচুর আদা, আদার গুঁড়া বা উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। গবেষণায় ব্যবহৃত আদার সাপ্লিমেন্ট এবং রান্নাঘরের তাজা আদা এক বিষয় নয়। তাই গবেষণায় কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা ব্যবহৃত হয়েছে বলেই সেটি নিজের জন্য অনুসরণ করা নিরাপদ ধরে নেওয়া যাবে না।
বেশি আদা খেলে সমস্যা হতে পারে?
প্রাকৃতিক হলেই কোনো কিছু সীমাহীনভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না। আদা মুখে গ্রহণ করলে কারও কারও পেটে অস্বস্তি, বুকজ্বালা, ডায়রিয়া এবং মুখ বা গলায় জ্বালাপোড়া হতে পারে।
বিশেষ করে আদার সাপ্লিমেন্ট নিতে চাইলে এবং আপনি নিয়মিত কোনো ওষুধ ব্যবহার করলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জানানো ভালো। কিছু ভেষজ উপাদান ও ওষুধের মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় আদা খাওয়া যাবে?
গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাবের ক্ষেত্রে আদা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে এবং সম্ভাব্য উপকারও দেখা গেছে। তবে গর্ভাবস্থায় খাবারের স্বাভাবিক পরিমাণের বাইরে আদার সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিজে থেকে নেওয়া উচিত নয়।
NCCIH গর্ভাবস্থায় আদার সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেয়। বিশেষ করে বমি এত বেশি হলে যে খাবার বা পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না, তখন ঘরোয়া উপায়ে সময় না কাটিয়ে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
সামান্য বমি বমি ভাব অনেক কারণে হতে পারে। কিন্তু বারবার বমি হওয়া, পানি ধরে রাখতে না পারা, তীব্র পেটব্যথা, রক্ত বমি, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে আদা খেয়ে অপেক্ষা করা উচিত নয়।
একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে হজমের সমস্যা থাকলেও এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না তা চিকিৎসকের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
শেষ কথা
আদা আমাদের পরিচিত ও সহজলভ্য একটি খাবার। গবেষণা অনুযায়ী বিশেষ করে গর্ভাবস্থাজনিত বমি বমি ভাব কমাতে এটি কিছু মানুষের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে মোশন সিকনেসসহ সব ধরনের বমি বা হজমের সমস্যার সমাধান হিসেবে আদাকে দেখা ঠিক নয়।
রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে আদা ব্যবহার করা সহজ উপায়। আর কোনো রোগের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আদার সাপ্লিমেন্ট নিতে চাইলে, বিশেষ করে গর্ভাবস্থা বা নিয়মিত ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
তথ্যসূত্র: NCCIH | PubMed গবেষণা পর্যালোচনা | PubMed এর বিস্তৃত আদা গবেষণা পর্যালোচনা