দুপুর বা রাতের খাবার শেষ করেই আমরা অনেকেই বসে পড়ি কিংবা শুয়ে বিশ্রাম নিই। কিন্তু খাবারের পর অল্প সময় হালকা হাঁটার অভ্যাস শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে খাবারের পর রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমানোর ক্ষেত্রে হাঁটা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।
তবে খাবারের পর হাঁটা মানেই দ্রুতগতিতে দীর্ঘ সময় হাঁটতে হবে এমন নয়। অল্প সময়ের হালকা হাঁটাও কাজে আসতে পারে। নিয়মিত হাঁটার সামগ্রিক উপকারিতা জানতে OneLifeBD এর প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটার উপকারিতা সম্পর্কিত লেখাটিও পড়তে পারেন।
খাওয়ার পর হাঁটলে কী হয়?
খাবার খাওয়ার পর কার্বোহাইড্রেট হজম হয়ে গ্লুকোজ রক্তে প্রবেশ করে। তখন রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে। হাঁটার সময় পেশি সক্রিয় হয় এবং শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে।
CDC এর ডায়াবেটিস ও শারীরিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত নির্দেশনায় নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডকে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। CDC এমনকি শুরু করার একটি সহজ উপায় হিসেবে রাতের খাবারের পর ১০ মিনিট হাঁটার উদাহরণ দিয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে খাওয়ার পর হাঁটলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হয়ে যাবে। খাবার, ওষুধ, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং চিকিৎসকের পরামর্শ সবকিছু মিলিয়েই ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা করতে হয়। ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে OneLifeBD এর রোগ ও স্বাস্থ্য বিভাগে আরও তথ্য রয়েছে।
গবেষণা কী বলছে?
খাবারের আগে হাঁটা ভালো নাকি পরে হাঁটা ভালো, এ প্রশ্ন নিয়েও গবেষণা হয়েছে। Sports Medicine এ প্রকাশিত systematic review ও meta analysis আটটি randomized crossover trial এর তথ্য বিশ্লেষণ করে। এতে মোট ১১৬ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন, যাদের মধ্যে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিও ছিলেন।
বিশ্লেষণে খাবারের পর exercise করলে খাবারের আগে exercise করা বা নিষ্ক্রিয় থাকার তুলনায় খাবারের পর রক্তে শর্করার বৃদ্ধি কম দেখা গেছে। গবেষণাটিতে খাবার এবং exercise এর মধ্যবর্তী সময়ও গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা যায়।
তবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল এবং অন্তর্ভুক্ত trial গুলোতে bias এর ঝুঁকি ছিল। তাই ফলাফলকে সবার জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা নির্দেশনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
খাবারের কতক্ষণ পর হাঁটা ভালো?
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা তৈরি হয়। খাবারের পর অবশ্যই ৩০ মিনিট বা এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতেই হবে এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। উপরের systematic review এর ফলাফলে খাবারের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরিবর্তে খাবারের কাছাকাছি সময়ে exercise করলে রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়ায় বেশি উপকার পাওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
আরেকটি postprandial exercise গবেষণায় খাবারের ১৫ মিনিট পর শুরু করা হাঁটায় খাবারের পর রক্তে শর্করার সর্বোচ্চ বৃদ্ধি কমতে দেখা গেছে। তবে এটি সুস্থ ব্যক্তিদের ওপর করা গবেষণা ছিল। তাই সাধারণভাবে খাবারের পর আরাম বোধ করলে অল্প সময়ের মধ্যে হালকা হাঁটা শুরু করা যেতে পারে। ভারী খাবারের পর পেটে অস্বস্তি থাকলে জোর করে দ্রুত হাঁটার প্রয়োজন নেই।
কতক্ষণ হাঁটবেন?
শুরুতেই ৩০ মিনিট হাঁটার দরকার নেই। CDC সহজ লক্ষ্য হিসেবে রাতের খাবারের পর ১০ মিনিট হাঁটার উদাহরণ দিয়েছে। আবার American Diabetes Association এর তথ্যেও খাবারের পর অল্প সময় হাঁটার কথা বলা হয়েছে। বাস্তব জীবনে ৫ থেকে ১০ মিনিট হালকা হাঁটা দিয়ে শুরু করা অনেকের জন্য সহজ হতে পারে। স্বাচ্ছন্দ্য থাকলে ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যায়।
একটি ছোট গবেষণায় ৩০ মিনিট brisk walking খাবারের পর glucose response কমিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের জন্য ৩০ মিনিটই আদর্শ এমন সিদ্ধান্ত এখান থেকে নেওয়া যায় না। শরীরচর্চা ও হাঁটার আরও ব্যবহারিক তথ্য OneLifeBD এর ফিটনেস ও ব্যায়াম বিভাগে পাওয়া যাবে।
খাওয়ার পর হালকা হাঁটা নাকি দ্রুত হাঁটা?
খাওয়ার পরপরই খুব দ্রুত হাঁটা সবার জন্য আরামদায়ক নাও হতে পারে। বিশেষ করে বেশি খাবার খাওয়ার পর দ্রুত হাঁটলে কারও পেটে ভারী লাগা বা অস্বস্তি হতে পারে।
তাই শুরুতে স্বাভাবিক বা হালকা গতিতে হাঁটা বাস্তবসম্মত। শরীর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে গতি কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত শরীরকে নড়াচড়ার মধ্যে রাখা, খাবারের পর নিজেকে কষ্ট দিয়ে ব্যায়াম করা নয়।
ডায়াবেটিস থাকলে বাড়তি সতর্কতা কেন?
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শারীরিক কর্মকাণ্ড রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে পারে এবং ইনসুলিন বা কিছু ওষুধ ব্যবহার করলে কারও কারও রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
American Diabetes Association এর হাঁটা ও ডায়াবেটিস সম্পর্কিত নির্দেশনায় নতুন করে হাঁটা শুরু করলে বা exercise এর মাত্রা বাড়ালে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
ইনসুলিন ব্যবহার করেন বা রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার ইতিহাস থাকলে খাবারের পর নিয়মিত exercise শুরু করার আগে নিজের চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো। খাবার নির্বাচনও রক্তে শর্করা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ বিষয়ে OneLifeBD এর খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগে আরও লেখা রয়েছে।
খাবারের পর বসে থাকার বদলে একটু হাঁটা
খাবারের পর দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকার পরিবর্তে অল্প হাঁটা একটি সহজ দৈনন্দিন অভ্যাস হতে পারে। দীর্ঘ সময় বসে থাকার মধ্যে হালকা হাঁটার বিরতি নিয়ে করা একটি systematic review ও meta analysis এ দেখা গেছে, হালকা হাঁটার বিরতি টানা বসে থাকার তুলনায় খাবারের পর glucose ও insulin response কমিয়েছে।
এটি থেকে বোঝা যায়, সারাদিনের শারীরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থাকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনে অভ্যাসটি কীভাবে করবেন?
আলাদা করে মাঠ বা পার্কে যাওয়া সব সময় সম্ভব নয়। দুপুর বা রাতের খাবারের পর বাড়ির বারান্দা, ছাদ, উঠান কিংবা ঘরের মধ্যেই কয়েক মিনিট হাঁটা যায়।
অফিসে দুপুরের খাবারের পর সুযোগ থাকলে কিছুক্ষণ করিডোরে বা নিরাপদ জায়গায় হাঁটা যেতে পারে। লিফটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার পরিবর্তে কিছুটা হাঁটাও দৈনন্দিন নড়াচড়া বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি অভ্যাস তৈরি করা যা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
কারা সতর্ক থাকবেন?
খাবারের পর হাঁটা বেশিরভাগ মানুষের জন্য সহজ ধরনের শারীরিক কর্মকাণ্ড হলেও সবার অবস্থা এক নয়। হৃদরোগ, গুরুতর শ্বাসকষ্ট, চলাফেরায় সমস্যা বা অন্য কোনো জটিল দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে নতুন exercise routine শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করলে রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার লক্ষণ সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। হাঁটার সময় বুকব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যা হলে হাঁটা বন্ধ করে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
শেষ কথা
খাবারের পর অল্প সময় হাঁটা একটি সহজ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে। গবেষণায় বিশেষ করে খাবারের পর রক্তে শর্করার বৃদ্ধি কমানোর ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য উপকার দেখা গেছে। সবার জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় বা হাঁটার দৈর্ঘ্য ঠিক করে দেওয়া যায় না। তবে খাবারের পর শরীর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে ৫ থেকে ১০ মিনিট হালকা হাঁটা দিয়ে শুরু করা বাস্তবসম্মত একটি উপায় হতে পারে।
আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, খাওয়ার পর হাঁটা কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার সঙ্গে এটিকে একটি ভালো দৈনন্দিন অভ্যাস হিসেবে দেখা যেতে পারে।