বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০২৬ সালে ৫১,৮৩৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের যেকোনো মাসের তুলনায় বেশি।
এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর বিপদের লক্ষণ আগে থেকেই জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্বর কমে গেলেই রোগী বিপদমুক্ত হয়েছেন, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গুরুতর ডেঙ্গুর কিছু warning sign বরং জ্বর কমে যাওয়ার পর দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুকে বর্তমানে বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখছে WHO। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংস্থাটি জানিয়েছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা নয়, মশা নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি, পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা একসঙ্গে প্রয়োজন।
ডেঙ্গু কী এবং কেন হয়?
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। সাধারণত Aedes aegypti মশা ডেঙ্গু ছড়ানোর প্রধান বাহক।
ডেঙ্গু সরাসরি একজন মানুষ থেকে আরেকজনের মধ্যে সাধারণ সংস্পর্শে ছড়ায় না। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য মানুষকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়ানোর চক্র চলতে পারে।
বাংলাদেশে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। WHO Bangladesh আরও বলছে, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনও মশার প্রজনন ও বেঁচে থাকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ কী?
ডেঙ্গু আক্রান্ত সবার একই ধরনের উপসর্গ হয় না। কারও উপসর্গ খুব হালকা হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
WHO অনুযায়ী সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
• উচ্চ জ্বর
• তীব্র মাথাব্যথা
• চোখের পেছনে ব্যথা
• পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা
• বমি বমি ভাব
• বমি
• ত্বকে র্যাশ
সাধারণত সংক্রমিত মশার কামড়ের ৪ থেকে ১০ দিন পর উপসর্গ শুরু হতে পারে এবং উপসর্গ প্রায় ২ থেকে ৭ দিন থাকতে পারে।
তবে শুধু উপসর্গ মিলিয়ে নিজে নিজে ডেঙ্গু নিশ্চিত করা উচিত নয়। জ্বরের সঙ্গে এসব লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ডেঙ্গুর বিপদের লক্ষণ কী কী?
এই অংশটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। WHO বলছে, গুরুতর ডেঙ্গুর critical phase সাধারণত অসুস্থতা শুরুর প্রায় ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে আসতে পারে। এ সময় শরীরের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। কিন্তু জ্বর কমে যাওয়াকে সবসময় সুস্থ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।
নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন:
• তীব্র পেটব্যথা
• বারবার বা একটানা বমি
• নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত
• বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত
• দ্রুত শ্বাস নেওয়া
• অস্বাভাবিক দুর্বলতা
• অস্থিরতা
• প্রচণ্ড তৃষ্ণা
• ত্বক ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
এসব লক্ষণ গুরুতর ডেঙ্গুর warning sign হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রক্তক্ষরণ, শক, শরীরে তরল জমা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এমন লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
জ্বর কমে গেলে কেন আরও সতর্ক থাকতে হবে?
ডেঙ্গু নিয়ে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, জ্বর চলে গেলে রোগী ভালো হয়ে যাচ্ছেন।
বাস্তবে গুরুতর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ঠিক এই সময়েই বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হতে পারে। WHO স্পষ্টভাবে বলছে, তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পরও severe dengue-এর warning signs দেখা দিতে পারে।
তাই জ্বর কমার পর রোগীর পেটব্যথা, বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা ত্বক ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন হচ্ছে কি না নজরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু হলে কী করবেন?
ডেঙ্গুর জন্য বর্তমানে নির্দিষ্ট কোনো antiviral চিকিৎসা নেই। WHO অনুযায়ী রোগীর বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য উপযুক্ত তরল গ্রহণ করতে হবে, বিশেষ করে বমি বা জ্বরের কারণে শরীর থেকে তরল কমে গেলে।
তবে রোগীর বয়স, অন্যান্য রোগ, গর্ভাবস্থা এবং শারীরিক অবস্থার ওপর চিকিৎসার প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। তাই গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে ঘরোয়া ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
কোন ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে?
এই সতর্কতাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
WHO ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে aspirin এবং ibuprofen-এর মতো NSAID জাতীয় ওষুধ এড়িয়ে চলতে বলেছে, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু করাও ঠিক নয়। ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, তাই কোন ওষুধ প্রয়োজন হবে তা রোগীর অবস্থা দেখে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
প্লাটিলেট কমলেই কি ভয় পাওয়ার কারণ?
ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের একটি জায়গা হচ্ছে platelet count। কিন্তু শুধু একটি পরীক্ষার সংখ্যা দিয়ে রোগীর অবস্থা বিচার করা উচিত নয়।
রোগীর রক্তপাত হচ্ছে কি না, রক্তচাপ, শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রস্রাব, পানিশূন্যতা, সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নেন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৫ সালে National Guideline for Clinical Management of Dengue-এর 5th Edition প্রকাশ করেছে। সেখানে ডেঙ্গু রোগীর মূল্যায়ন ও চিকিৎসার জন্য জাতীয় নির্দেশনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু গাইডলাইন ও ম্যানুয়াল
তাই শুধু platelet কমেছে দেখে আতঙ্কিত হওয়া কিংবা নিজে থেকে কোনো চিকিৎসা শুরু করার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর সামগ্রিক অবস্থা মূল্যায়ন করা উচিত।
শিশু, গর্ভবতী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
ডেঙ্গু যেকোনো বয়সে হতে পারে। তবে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকে অন্য কোনো গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা থাকা রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি না করাই ভালো।
বিশেষ করে রোগী তরল গ্রহণ করতে না পারলে, বারবার বমি হলে, খুব দুর্বল হয়ে পড়লে বা উপরে উল্লেখ করা কোনো warning sign দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কী করবেন?
ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল উপায় হচ্ছে এডিস মশার বংশবিস্তার কমানো এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, বালতি, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার বা অন্য কোথাও পানি জমে থাকতে দেওয়া উচিত নয়। পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
WHO পানি রাখার পাত্র অন্তত সপ্তাহে একবার খালি ও পরিষ্কার করা, কঠিন বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ এবং পানি জমতে পারে এমন অপ্রয়োজনীয় পাত্র সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এডিস মশা দিনের বেলাতেও সক্রিয়। তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্পূর্ণ হয় না। শরীর ঢাকা পোশাক, জানালায় জালি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত mosquito repellent ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী থাকলে মশারি কেন জরুরি?
ডেঙ্গু রোগীকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড়ালে সেই মশা পরবর্তী সময়ে অন্য মানুষকে কামড়িয়ে ভাইরাস ছড়াতে পারে। WHO তাই অসুস্থতার সময় রোগীকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেয়।
দিনের বেলায় ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে এখন ডেঙ্গুর পরিস্থিতি কেমন?
পরিস্থিতিটি বর্তমানে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছরে ৫১,৮৩৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১৪৯ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। The Daily Star-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে DGHS-এর তথ্য উদ্ধৃত করে এই পরিস্থিতিকে চলতি বছরের মাসভিত্তিক সর্বোচ্চ মৃত্যুর পর্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
The Daily Star-এর সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রতিবেদন
এর কয়েক দিন আগেই ৮ সেপ্টেম্বর একদিনে ১,৫৭১ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা তখন পর্যন্ত চলতি বছরের একদিনে সর্বোচ্চ ছিল।
The Daily Star-এর ৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন
WHO Bangladesh-ও ৫ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, ডেঙ্গু বাংলাদেশে এখনো একটি বড় জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ। সংস্থাটি মশার প্রজননস্থল কমানো, নজরদারি শক্তিশালী করা এবং যথাযথ clinical care নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
WHO Bangladesh-এর সাম্প্রতিক ডেঙ্গু মূল্যায়ন
জরুরি প্রয়োজনে কোথায় যোগাযোগ করবেন?
স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যায়।
তবে রোগীর তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অন্য কোনো গুরুতর warning sign দেখা দিলে শুধু ফোনে পরামর্শের অপেক্ষায় থাকা উচিত নয়। দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা জরুরি বিভাগে রোগীকে নিয়ে যেতে হবে।
জীবনসংকটপূর্ণ জরুরি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরেও যোগাযোগ করা যায়।
শেষ কথা
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিয়ন্ত্রণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আক্রান্ত হওয়ার পর ডেঙ্গুর বিপদের লক্ষণ দ্রুত চিনতে পারাও জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ ধরে নেওয়া উচিত নয়। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, দ্রুত শ্বাস, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে ত্বকের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
একই সঙ্গে নিজের বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করুন। পরিবারের কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখুন। ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ের এই ছোট ছোট সতর্কতাই সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি চিকিৎসকের রোগ নির্ণয় বা ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।