ডেঙ্গু হলে জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিঁটে ব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা ত্বকে র্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বেশিরভাগ মানুষই সঠিক পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু দ্রুত গুরুতর অবস্থায় চলে যেতে পারে। তাই কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত, তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, জ্বর কমে যাওয়া সব সময় সুস্থ হওয়ার লক্ষণ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেঙ্গু বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর ডেঙ্গুর কিছু বিপদের সংকেত জ্বর চলে যাওয়ার পরও দেখা দিতে পারে। তাই এই সময় রোগীর অবস্থা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ কী কী
ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সবার উপসর্গ দেখা দেয় না। যাদের উপসর্গ হয়, তাদের মধ্যে সাধারণত জ্বরের পাশাপাশি তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও গিঁটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি এবং ত্বকে র্যাশ দেখা যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ উপসর্গযুক্ত রোগী সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কার অবস্থা গুরুতর হবে তা শুধু জ্বরের মাত্রা দেখে বোঝা যায় না।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ও রোগী ব্যবস্থাপনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু গাইডলাইন রয়েছে। সেখানে National Guideline for Clinical Management of Dengue এর ২০২৫ সালের পঞ্চম সংস্করণসহ চিকিৎসকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গুতে যে লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত
ডেঙ্গু রোগীর তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা কিংবা ত্বক ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
এগুলো গুরুতর ডেঙ্গুর warning signs হতে পারে। WHO এর নির্দেশনা অনুযায়ী এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রয়োজন।
গুরুতর ডেঙ্গুতে শরীর থেকে রক্তনালির বাইরে তরল বেরিয়ে যাওয়া, শক, গুরুতর রক্তক্ষরণ কিংবা অঙ্গের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে বিপদের সংকেত দেখা দেওয়ার পর বাড়িতে অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
জ্বর কমে গেলে কেন আরও সতর্ক থাকতে হবে
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। অনেকেই মনে করেন জ্বর নেমে গেলে রোগী সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। বাস্তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ঠিক এই সময় থেকেই গুরুতর সমস্যা শুরু হতে পারে।
WHO বলছে, ডেঙ্গুর critical phase সাধারণত অসুস্থতার তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের দিকে দেখা দিতে পারে এবং তখন শরীরের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। CDC এর ডেঙ্গু রোগীর পরিচর্যা নির্দেশনা অনুযায়ী, গুরুতর ডেঙ্গুর warning signs অনেক ক্ষেত্রে জ্বর চলে যাওয়ার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শুরু হয়।
তাই জ্বর কমেছে দেখে রোগীকে একেবারে ঝুঁকিমুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়। বরং পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অস্থিরতার মতো পরিবর্তন হচ্ছে কি না খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, শ্বাস নিতে কষ্ট বা দ্রুত শ্বাস, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, বমিতে রক্ত, পায়খানায় রক্ত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা ত্বকের মতো বিপদের সংকেত দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।
গুরুতর ডেঙ্গু একটি medical emergency। দ্রুত সঠিক চিকিৎসা শুরু করা রোগীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশভিত্তিক স্বাস্থ্য গবেষণা ও অন্যান্য যাচাইকৃত তথ্য OneLifeBD এর Health Research বিভাগে পাওয়া যাবে।
বাড়িতে থাকলে কীভাবে যত্ন নেবেন
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রাম এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। পানি ছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী ইলেকট্রোলাইটযুক্ত তরল গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে রোগীর বয়স, অন্যান্য রোগ এবং শারীরিক অবস্থার কারণে তরলের প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে, তাই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করাই নিরাপদ।
জ্বর বা ব্যথার জন্য WHO ও CDC প্যারাসিটামলের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন নিজে থেকে গ্রহণ করা উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্য কোনো ওষুধ নেওয়ার প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শুধু প্লাটিলেট সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না
ডেঙ্গু রোগীর রক্ত পরীক্ষার ফল চিকিৎসক রোগীর সামগ্রিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করেন। তাই শুধু একটি প্লাটিলেট সংখ্যাকে দেখে রোগী ভালো বা খারাপ আছেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়।
বিশেষ করে বিপদের কোনো লক্ষণ থাকলে পরীক্ষার একটি সংখ্যা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে বলে হাসপাতালে যেতে দেরি করা উচিত নয়। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল মিলিয়েই চিকিৎসক পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেন।
পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মশার কামড় থেকে রক্ষা করুন
ডেঙ্গু সরাসরি সাধারণ সংস্পর্শে একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানো এডিস মশা ভাইরাস গ্রহণ করে পরে অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
তাই অসুস্থ অবস্থাতেও মশার কামড় এড়ানো জরুরি। দিনের বেলায় ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
শেষ কথা
ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো জ্বর কমে যাওয়াকে নিশ্চিত সুস্থতার লক্ষণ মনে করা। জ্বর কমার পরও রোগীর তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, দ্রুত শ্বাস, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অস্থিরতার মতো বিপদের সংকেত দেখা দিতে পারে।
এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে বাড়িতে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন। সময়মতো বিপদের সংকেত শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসা পাওয়া গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, CDC
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য। এটি চিকিৎসকের ব্যক্তিগত পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।