উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ না থাকলেও বিপদ কেন? কত হলে চিন্তার কারণ

উচ্চ রক্তচাপ এমন একটি স্বাস্থ্য সমস্যা, যা অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই বছরের পর বছর শরীরের ক্ষতি করতে পারে। এ কারণেই একে প্রায়ই নীরব ঘাতক বলা হয়। বাংলাদেশেও সমস্যাটি ছোট নয়। WHO-এর সর্বশেষ বাংলাদেশভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটি ২৮ লাখ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন, অথচ নিয়ন্ত্রণে ছিল মাত্র ১৬ শতাংশের রক্তচাপ।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরা না থাকলেই রক্তচাপ স্বাভাবিক এমন ধারণা ঠিক নয়। নিয়মিত রক্তচাপ মাপা তাই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বয়স বাড়লে কিংবা ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদরোগ, অতিরিক্ত ওজন বা পারিবারিক ঝুঁকি থাকলে।

উচ্চ রক্তচাপ আসলে কী?

হৃদপিণ্ড যখন শরীরে রক্ত পাঠায়, তখন রক্তনালির দেয়ালে একটি চাপ তৈরি হয়। রক্তচাপের দুটি সংখ্যা থাকে। প্রথমটি সিস্টোলিক এবং দ্বিতীয়টি ডায়াস্টোলিক চাপ।

WHO-এর উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ভিন্ন দুই দিনে রক্তচাপ মেপে সিস্টোলিক চাপ ১৪০ mmHg বা তার বেশি এবং অথবা ডায়াস্টোলিক চাপ ৯০ mmHg বা তার বেশি পাওয়া গেলে উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় করা হয়। তবে একটি মাত্র বেশি রিডিং দেখেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ শুরু করা উচিত নয়। চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের National Guideline on Hypertensionও দেশে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার জন্য চিকিৎসকদের বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়।

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ কী?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়। উচ্চ রক্তচাপের অধিকাংশ রোগীর কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই শরীর ভালো লাগছে বলে রক্তচাপও ভালো আছে এমন ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। নিশ্চিতভাবে জানার উপায় হলো সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপা।

রক্তচাপ খুব বেশি হলে কিছু মানুষের তীব্র মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অন্য গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমন অবস্থায় বিশেষ করে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা দৃষ্টিশক্তির হঠাৎ পরিবর্তন হলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ কতটা বড় সমস্যা?

WHO-এর সর্বশেষ country profile অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের আনুমানিক হার ২৮ শতাংশ। প্রায় ২ কোটি ২৮ লাখ আক্রান্ত মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৫২ শতাংশের রোগ শনাক্ত হয়েছে, ৩৯ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং মাত্র ১৬ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বাংলাদেশের পুরোনো তথ্যের সঙ্গেও বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য চোখে পড়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, STEPS Survey অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপের হার ২০১০ সালের ১৭.৯ শতাংশ থেকে ২০১৮ সালে ২১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ২৪.৫ শতাংশে পৌঁছেছিল।

সাম্প্রতিক বাস্তব পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ। The Daily Star-এর মে ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, ধূমপান পরিহার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

কেন উচ্চ রক্তচাপ হয়?

একটি নির্দিষ্ট কারণ সব রোগীর ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। বয়স, বংশগত ঝুঁকি, অতিরিক্ত লবণ খাওয়া, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, তামাক ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কিডনি রোগসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও রক্তচাপ বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লবণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। WHO-এর 2025 country profile-এ বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের গড় লবণ গ্রহণের পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৯ গ্রাম দেখানো হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের জন্য তৈরি WHO Hypertension Management Protocol কম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয় এবং মোট লবণ দিনে এক চা চামচের নিচে রাখার কথা বলে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কী করবেন?

শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পুরো সমাধান নয়। WHO এবং বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা নির্দেশনায় কম লবণযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, তামাক পরিহার, অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং পর্যাপ্ত ফল ও সবজি খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে সঠিক খাবার বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে OneLifeBD-এর ওজন কমাতে কার্বোহাইড্রেট নিয়ে বিস্তারিত লেখাটি পড়তে পারেন।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত প্রায় ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমও উপকারী। তবে চিকিৎসক যদি উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দিয়ে থাকেন, রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়েছে বলে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরও অনেক মানুষের নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন হয়।

বাড়িতে রক্তচাপ মাপার সময় যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

চা বা কফি খাওয়ার পরপর, ধূমপানের পর, ব্যায়ামের পর অথবা খুব উত্তেজিত অবস্থায় রক্তচাপ মাপলে সাময়িকভাবে বেশি রিডিং আসতে পারে। বাংলাদেশের সরকারি নির্দেশনায় এমন পরিস্থিতিতে কিছু সময় অপেক্ষা করে আবার রক্তচাপ মাপার কথা বলা হয়েছে।

রক্তচাপ মাপার আগে কয়েক মিনিট শান্তভাবে বসে থাকা ভালো। হাতকে আরামদায়ক অবস্থায় রেখে সঠিক মাপের কাফ ব্যবহার করতে হবে। বাড়িতে অস্বাভাবিক রিডিং পেলে কয়েকবার সঠিক নিয়মে মেপে ফল লিখে রাখা এবং চিকিৎসককে দেখানো বেশি কার্যকর।

নিয়ন্ত্রণ না করলে কী হতে পারে?

দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি, চোখ এবং রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে। এর সঙ্গে স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি নির্দেশিকাতেও হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ এবং চোখের ক্ষতিকে উচ্চ রক্তচাপের গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

WHO-এর হিসাবে বাংলাদেশের ২০২১ সালের হৃদরোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ৫২ শতাংশ উচ্চ সিস্টোলিক রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এই তথ্যটি বোঝায় কেন লক্ষণ হওয়ার অপেক্ষা না করে আগেই রক্তচাপ জানা ও নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে কোথায় রক্তচাপ পরীক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়া যায়?

দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় NCD Corner-এর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে প্রায় ৯ লাখ ১৮ হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগী নিবন্ধিত ছিলেন বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে The Daily Star জানিয়েছে। নিবন্ধিত সক্রিয় রোগীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে একই প্রতিবেদনে কিছু সরকারি কেন্দ্রে ওষুধের সরবরাহ সংকটের কথাও উঠে এসেছে।

শেষ কথা

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল হলো লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করা। শরীর ভালো লাগলেও রক্তচাপ বেশি থাকতে পারে। তাই বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদরোগ, অতিরিক্ত ওজন বা পারিবারিক ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

একবার বেশি রিডিং পাওয়া মানেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার বারবার বেশি পাওয়া রিডিং উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। সঠিকভাবে মাপুন, ফল লিখে রাখুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

এই লেখা স্বাস্থ্যসচেতনতার জন্য। এটি ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

Leave a Comment