রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস দুধ খাওয়ার অভ্যাস আমাদের অনেকেরই আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ছোটবেলা থেকেই অনেক পরিবারে শোনা যায়, রাতে দুধ খেলে শরীর ভালো থাকে এবং ঘুমও ভালো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাতে ঘুমানোর আগে দুধ খাওয়া কি সত্যিই ঘুমের জন্য উপকারী, নাকি এটি শুধুই প্রচলিত ধারণা?
বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের সঙ্গে ভালো ঘুমের একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুধু এক গ্লাস দুধ খেলেই অনিদ্রা দূর হয়ে যাবে, এমন প্রমাণ এখনো নেই।
দুধ কেন ঘুমে সাহায্য করতে পারে?
দুধে ট্রিপটোফ্যান নামের একটি প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। শরীর ট্রিপটোফ্যান ব্যবহার করে সেরোটোনিন এবং পরে মেলাটোনিন তৈরির প্রক্রিয়ায়। মেলাটোনিন আমাদের শরীরের ঘুম ও জেগে থাকার স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে জড়িত।
দুধের প্রোটিনেও ট্রিপটোফ্যান থাকে। এ কারণে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ঘুমের ওপর কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না তা নিয়ে গবেষণা করছেন। দুধ ও ঘুমের সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় এর সম্ভাব্য ভূমিকা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
গবেষণা কী বলছে?
সাম্প্রতিক গবেষণার ফল বেশ আশাব্যঞ্জক, তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি systematic review ও meta analysis এ কয়েকটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল একত্রে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে ঘুমের মান কিছুটা উন্নত হওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
এর আগের আরেকটি systematic review এও বিভিন্ন বয়সের মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণা বিশ্লেষণ করে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ঘুমের জন্য উপকারী হতে পারে বলে দেখা গেছে। তবে সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ রাতে দুধ খাওয়া সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটিকে ঘুমের সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
গরম দুধ কি ঠান্ডা দুধের চেয়ে ভালো?
গরম দুধ খেলে অনেকের আরাম লাগে এবং ঘুমের আগে শান্ত অনুভূতি তৈরি হয়। তবে গরম দুধ যে ঠান্ডা দুধের তুলনায় সরাসরি বেশি ঘুম আনে, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।
তাই আপনার যদি রাতে হালকা গরম দুধ খেতে ভালো লাগে, সেটি ঘুমের আগের একটি আরামদায়ক অভ্যাস হতে পারে। তবে দুধ অতিরিক্ত গরম করে পান করার প্রয়োজন নেই।
কতটুকু দুধ খাওয়া যেতে পারে?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে রাতে অল্প বা মাঝারি পরিমাণ দুধই যথেষ্ট। একবারে অনেক বেশি দুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে কারও কারও অস্বস্তি হতে পারে।
ভালো ঘুমের জন্য শুধু দুধের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা, রাতে অতিরিক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং বিকেল বা সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন না খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। CDC এর ঘুমের নির্দেশনায় এসব অভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সবার জন্য কি রাতে দুধ ভালো?
না। দুধ খাওয়ার পর যদি আপনার পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটব্যথা বা ডায়রিয়া হয়, তাহলে আপনার ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকতে পারে। এমন অবস্থায় রাতে সাধারণ দুধ খেলে আরাম পাওয়ার বদলে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases অনুযায়ী, ল্যাকটোজ ঠিকমতো হজম করতে না পারলে দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এ ধরনের হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশে আমাদের কী মনে রাখা উচিত?
বাংলাদেশে গরুর দুধ, প্যাকেটজাত পাস্তুরিত দুধ এবং গুঁড়া দুধ সহজেই পাওয়া যায়। আপনি যদি নিয়মিত দুধ পান করেন, তাহলে নিরাপদ ও বিশ্বস্ত উৎসের দুধ বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা দুধ হলে যথাযথভাবে ফুটিয়ে পান করা উচিত।
আর রাতে দুধ খাওয়ার সময় প্রচুর চিনি মেশানোর অভ্যাস থাকলে সেটিও কমিয়ে দেওয়া ভালো। দুধকে ঘুমের ওষুধ না ভেবে একটি পুষ্টিকর খাবার হিসেবেই দেখা সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।
পুষ্টিকর খাবার নিয়ে আরও জানতে OneLifeBD এর ডায়েট ও পুষ্টি বিষয়ক লেখা পড়তে পারেন। ওজন নিয়ন্ত্রণে কার্বোহাইড্রেট নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলে আমাদের ওজন কমাতে উপকারী কার্বোহাইড্রেট নিয়ে লেখাটিও দেখে নিতে পারেন।
শেষ কথা
রাতে ঘুমানোর আগে দুধ খাওয়া কিছু মানুষের জন্য আরামদায়ক হতে পারে এবং গবেষণায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের সঙ্গে ভালো ঘুমের সম্ভাব্য সম্পর্কও পাওয়া গেছে। কিন্তু এক গ্লাস দুধকে অনিদ্রার চিকিৎসা ভাবা ঠিক নয়।
আপনার শরীরে দুধ সহ্য হলে রাতে পরিমিত পরিমাণে হালকা গরম দুধ খেতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ঘুম না হওয়া, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দিনের স্বাভাবিক কাজে ঘুমের সমস্যার প্রভাব পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
দ্রষ্টব্য: এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
1 thought on “রাতে ঘুমানোর আগে দুধ খাওয়া কি সত্যিই উপকারী?”