বাংলাদেশে মানসিক কষ্ট নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এখনো অনেকের জন্য সহজ নয়। কেউ দীর্ঘদিন ভেতরে ভেতরে অসহায় বোধ করলেও পরিবার বা কাছের মানুষের কাছে তা প্রকাশ করতে পারেন না। অথচ আত্মহত্যার ঝুঁকির সংকেত সময়মতো বুঝতে পারলে এবং বিচার না করে পাশে দাঁড়ালে একজন মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয় ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, বাংলাদেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। WHO এর হিসাবে ২০২১ সালে বাংলাদেশে ৪,৭১৪ জন আত্মহত্যায় মারা গেছেন। তাই বিষয়টিকে লজ্জা বা গোপন করার বিষয় না ভেবে স্বাস্থ্যগত সংকট হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। (World Health Organization)
আত্মহত্যার ঝুঁকির সংকেত কী হতে পারে
একজন মানুষের মন খারাপ হলেই তিনি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন এমন নয়। আবার সংকটে থাকা প্রত্যেক মানুষের মধ্যেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না।
WHO এর হালনাগাদ নির্দেশনায় কয়েকটি আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। যেমন আচরণ বা মনের অবস্থায় বড় পরিবর্তন, পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বেঁচে থাকার কোনো কারণ নেই এমন কথা বলা, মৃত্যুর কথা বারবার বলা, প্রিয় জিনিস অন্যদের দিয়ে দেওয়া বা কাছের মানুষদের অস্বাভাবিকভাবে বিদায় জানানোর মতো আচরণ। (World Health Organization)
এ ধরনের পরিবর্তন দেখলে উপহাস করা, দুর্বলতা হিসেবে দেখা বা “এগুলো কিছুই না” বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
সরাসরি জিজ্ঞেস করলে কি ঝুঁকি বেড়ে যায়
বাংলাদেশে অনেক পরিবারেই একটি ভয় কাজ করে যে আত্মহত্যার কথা সরাসরি জিজ্ঞেস করলে হয়তো মানুষের মাথায় নতুন করে সেই চিন্তা ঢুকে যাবে। কিন্তু WHO বলছে, এটি একটি ভুল ধারণা।
কাছের কারও আচরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে শান্তভাবে তিনি নিজের ক্ষতি করার বা আত্মহত্যার কথা ভাবছেন কি না জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। এভাবে জিজ্ঞেস করলে আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণের ঝুঁকি বাড়ে না। বরং মানুষটি নিজের কষ্ট নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেতে পারেন। (World Health Organization)
কাছের মানুষকে কীভাবে সাহায্য করবেন
প্রথম কাজ হলো মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা। সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেওয়া, দোষ খোঁজা অথবা অন্য কারও জীবনের সঙ্গে তুলনা না করে তিনি কী অনুভব করছেন তা বোঝার চেষ্টা করুন।
WHO Bangladesh পরিবার, বন্ধু ও সমাজকে সংকটের লক্ষণ চিনতে এবং বিচার না করে কথা শোনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করুন। (World Health Organization)
“তোমার তো সব আছে, এত চিন্তা করছ কেন” অথবা “মন শক্ত করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে” ধরনের কথা কষ্টে থাকা ব্যক্তিকে আরও বিচ্ছিন্ন বোধ করাতে পারে। তার পরিবর্তে বোঝানো যেতে পারে যে তার কথা শোনার জন্য আপনি আছেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা খুঁজতে তার পাশে থাকবেন।
কখন বিষয়টিকে জরুরি হিসেবে নিতে হবে
কেউ যদি স্পষ্টভাবে নিজের জীবন শেষ করার কথা বলেন, নিজেকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতি করার আশঙ্কা থাকে অথবা তার আচরণ দেখে তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা হয়, তখন তাকে একা ফেলে রাখা উচিত নয়। দ্রুত পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যকে জানান এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন।
WHO এর পরামর্শ অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে অন্য বিশ্বস্ত মানুষ এবং স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা নিতে হবে। (EMRO)
বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বিপদের ক্ষেত্রে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া বা জরুরি সেবার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
মানসিক কষ্টকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়
মানসিক সংকটের পেছনে একটি মাত্র কারণ থাকে না। WHO এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার সঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানসিক, জৈবিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকতে পারে। তাই কোনো একটি ঘটনা দেখে একজন মানুষ কেন এমন অবস্থায় পৌঁছেছেন তার সরল ব্যাখ্যা দেওয়া ঠিক নয়। (World Health Organization)
বাংলাদেশেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার উদ্যোগ চলছে। WHO এর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সময়কালের একটি জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। (World Health Organization)
কথা বলা হতে পারে সাহায্যের প্রথম ধাপ
কাছের কোনো মানুষের আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে বা তিনি গভীর হতাশা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে কথা বলুন। সব সমস্যার সমাধান আপনাকেই করতে হবে এমন নয়। আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হতে পারে তার কথা শোনা এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করা।
মানসিক স্বাস্থ্যও আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অংশ। তাই শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক কষ্টের ক্ষেত্রেও সময়মতো সাহায্য চাওয়াকে স্বাভাবিকভাবে দেখা প্রয়োজন।